পতঙ্গদের সাধারণত সহজাত প্রবৃত্তিনির্ভর প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নতুন এক গবেষণা সেই ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছির মতো ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের প্রাণীরাও কোনো ধরনের পূর্ব প্রশিক্ষণ ছাড়াই হাতিয়ার ব্যবহার করে জটিল সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মৌমাছিরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট বস্তুকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে এবং এর মাধ্যমে এমন লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, যা অন্যভাবে সম্ভব নয়। গবেষণাটিকে প্রাণিজগতের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রচলিত ধারণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা জানতেন, শিম্পাঞ্জি, বিভিন্ন প্রজাতির বানর, হাতি ও কাকের মতো প্রাণীরা তাৎক্ষণিক বুদ্ধি খাটিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে। প্রায় এক শতাব্দী আগে পরিচালিত এক বিখ্যাত পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, শিম্পাঞ্জিরা একটির ওপর আরেকটি বাক্স সাজিয়ে উঁচুতে ঝুলে থাকা কলা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সেই ধারণারই একটি পরিবর্তিত সংস্করণ মৌমাছিদের ওপর প্রয়োগ করেন। পরীক্ষায় একটি কৃত্রিম ফুল এমনভাবে স্থাপন করা হয়, যা সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। সেখানে পৌঁছাতে মৌমাছিদের একটি পলিস্টাইরিন বল গড়িয়ে ফুলটির নিচে নিয়ে যেতে হয় এবং পরে সেই বলের ওপর উঠে খাবার সংগ্রহ করতে হয়।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওলুর আচরণগত বাস্তুসংস্থানবিদ ড. ওলি লৌকোলা বলেছেন, “অধিকাংশ মানুষ মনে করেন কীটপতঙ্গরা কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় চলাফেরা করা এক ধরনের যন্ত্রের মতো। তারা ভাবেন এদের কোনো আবেগীয় অনুভূতি বা ব্যথা পাওয়ার সক্ষমতা নেই। কিছু মানুষ তো এটাও জানেন না, এদের মস্তিষ্ক আছে।
“আমার ধারণা, গবেষণার এসব ফলাফল আমাদের আশপাশের জগত সম্পর্কে মানুষের সেই পুরানো দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে।”
গবেষণায় অংশ নেওয়া মৌমাছিদের প্রথমে নীল রঙের কৃত্রিম ফুলের সঙ্গে চিনিমিশ্রিত পানির পুরস্কার যুক্ত করে পরিচিত করা হয়। পরে মূল পরীক্ষায় ফুলটিকে এমন স্থানে রাখা হয়, যেখানে উড়ে গিয়ে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। ফলে বলটিকে সঠিক স্থানে সরিয়ে নেওয়াই ছিল একমাত্র উপায়।
পরীক্ষার প্রথম ধাপে প্রায় ৭৫ শতাংশ মৌমাছি সফলভাবে ফুলের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এরপর বিজ্ঞানীরা আরও কঠিন পরীক্ষা নেন, যেখানে মৌমাছিদের ফুলের অবস্থান স্মরণ করে বলটি সঠিক স্থানে নিতে হয়। এ পর্যায়ে ৩০টির মধ্যে ২৩টি মৌমাছি সফলভাবে কাজটি সম্পন্ন করে।
ড. লৌকোলা বলেছেন, “এমনটা চিরাচরিত বক্স-অ্যান্ড-ব্যানানা সমস্যারই এক পতঙ্গ সংস্করণ। এখানে প্রাণীটিকে অবশ্যই বুঝতে হয়, একটি বস্তুর স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব এবং সেটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এমন এক লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, যা অন্যথায় সম্ভব নয়।
“এ গবেষণার উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এ ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এখন কীটপতঙ্গের মধ্যেও প্রমাণিত হল।”
গবেষকরা সম্ভাব্য বিকল্প ব্যাখ্যাও পরীক্ষা করেছেন। তারা জানতে চেয়েছিলেন, মৌমাছিরা কেবল বল নিয়ে খেলছিল কি না বা নীল রঙের প্রতি আকর্ষণ থেকেই কাজটি করেছে কি না। তবে অতিরিক্ত পরীক্ষাগুলোতে দেখা যায়, মৌমাছিরা স্মৃতির সাহায্যে ফুলের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে এবং পরিকল্পিতভাবে বলটি সেখানে নিয়ে যায়।
কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আচরণগত বাস্তুসংস্থানবিদ অধ্যাপক লার্স চিটকা বলেছেন, “গবেষণাগারে আমরা মৌমাছিদের নানা ধরনের অসাধারণ কাজ করতে দেখেছি, যার মধ্যে গণনা বা নিখুঁতভাবে কোনো বস্তু নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় রয়েছে। এরা প্রতিবারই আমাকে অবাক করেছে।
“কোনো পরিস্থিতিতে ঠিক কী করতে হবে সে বিষয়ে এদের এক ধরনের বোধশক্তি বা বোঝাপড়া যে রয়েছে। আর আমাদের এ গবেষণা তারই সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সাধারণ ধারণা, বুদ্ধিমান আচরণের জন্য বড় মস্তিষ্কের প্রয়োজন, কারণ আমরা নিজেরা বড় মস্তিষ্কের অধিকারী ও প্রাণীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি বুদ্ধিমান।
“তবে ক্ষুদ্র স্নায়ুতন্ত্রের ভেতরেও ঠিক কতখানি বুদ্ধিমত্তা ঠাসা বা গুছিয়ে রাখা সম্ভব তার আদর্শ উদাহরণ মৌমাছিরা, যা আমাদের আশপাশের অন্য প্রাণীদের প্রতি কিছুটা শ্রদ্ধা বা সম্মান দেখানো দারুণ স্মারক।”
গবেষণাটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই ফলাফল প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা ও শেখার ক্ষমতা সম্পর্কে নতুন আলোচনা উন্মোচন করবে।
সিএ/এমআর


