কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থান, সৃজনশীলতা এবং মানবিক চিন্তাশক্তি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ব্যয় কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে এআই ব্যবহারের পরিধি বাড়াচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু কর্মক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের চিন্তার বৈচিত্র্য এবং সামাজিক জ্ঞানচর্চার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৩ সালে আইবিএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছিলেন, এআইয়ের কারণে ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে। একই সময়ে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান মানুষের পরিবর্তে এআইকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ বাড়িয়েছে। সুইডিশ ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ক্লার্না দাবি করেছে, তাদের একটি এআই সিস্টেম শত শত কর্মীর সমপরিমাণ কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করার ক্ষেত্রে এআই কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে এবং পরিচালন ব্যয় কমছে। তবে এর পাশাপাশি দেখা দিচ্ছে আরেকটি প্রশ্ন—মানবিক সৃজনশীলতা এবং মৌলিক চিন্তার ভবিষ্যৎ কী হবে?
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই দিয়ে তৈরি বিভিন্ন গল্প বা কনটেন্ট আলাদাভাবে আকর্ষণীয় মনে হলেও একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল লক্ষ্য করা যায়। গবেষকরা এ প্রবণতাকে ‘ট্র্যাজেডি অব দ্য কমনস’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত সুবিধা শেষ পর্যন্ত সামষ্টিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম মূলত মানুষের তৈরি বিপুল পরিমাণ জ্ঞান ও ভাষাগত উপাত্তের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, এআইয়ের সক্ষমতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে মানবসভ্যতার দীর্ঘদিনের জ্ঞানভান্ডারের ওপর। ফলে মানুষের সৃজনশীল অবদান কমে গেলে ভবিষ্যতে এআইয়ের বিকাশও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এআই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘মডেল কলাপস’। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যদি কোনো এআই মডেল ক্রমাগত নিজের তৈরি উপাত্ত থেকেই প্রশিক্ষণ নিতে থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে জ্ঞানগত বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে। এতে ব্যতিক্রমী ধারণা, নতুন প্রশ্ন এবং সৃজনশীল চিন্তার জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এদিকে ব্যবহারকারীদের আচরণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, অনেক মানুষ এআই থেকে পাওয়া তথ্য পুনরায় যাচাই না করেই গ্রহণ করছেন। এর ফলে তথ্য বিশ্লেষণ, প্রশ্ন করা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষেত্রে জুনিয়র পর্যায়ের নিয়োগ কমে গেলে ভবিষ্যতের দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতা, ভুল থেকে শিক্ষা এবং মেন্টরশিপের মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জিত হয়, তা এখনো প্রযুক্তি দিয়ে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
তাদের মতে, এআইকে কেবল কর্মী ছাঁটাইয়ের উপায় হিসেবে নয়, বরং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি লাভবান হবে। কারণ প্রযুক্তির শক্তির পাশাপাশি মানবিক সংযোগ, সৃজনশীলতা এবং বৈচিত্র্যময় চিন্তাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে থাকবে।
সিএ/এমআর


