প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে ক্ষুদ্র পতঙ্গের মস্তিষ্ক নিয়ে পরিচালিত গবেষণা। গবেষকদের দাবি, মাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা এবং তথ্য বিশ্লেষণের কৌশল ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত ও কার্যকর করে তুলতে পারে। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ও রোবট প্রযুক্তিতে এ গবেষণার প্রভাব হতে পারে বড় ধরনের।
গবেষকদের মতে, ফলের মাছি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র পতঙ্গ এমনভাবে নিজেদের চারপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করে, যা বর্তমান এআই ব্যবস্থার জন্য নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারে। তাদের এই প্রাকৃতিক দক্ষতা ব্যবহার করে এমন প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং কম শক্তি ব্যবহার করেও কার্যকরভাবে কাজ করবে।
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড’-এর একদল গবেষক মাছির চোখ ও মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করে একটি বিশেষ ক্ষমতার সন্ধান পেয়েছেন। বিজ্ঞানীরা এটিকে ‘হাই-ফ্রিকোয়েন্সি জাম্পিং’ নামে উল্লেখ করেছেন, যা অনেকটা ‘টার্বো বুস্ট’-এর মতো কাজ করে। এর মাধ্যমে পতঙ্গ খুব দ্রুত পরিবেশ বুঝে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পতঙ্গরা কেবল স্থিরভাবে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে না। বরং তারা নিজেদের দেহ ও চোখের সূক্ষ্ম নড়াচড়ার মাধ্যমে পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। এ ধরনের ক্ষুদ্র ও দ্রুত নড়াচড়াকে বিজ্ঞানীরা ‘স্যাকাডস’ বলে থাকেন। এর ফলে তারা আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও দ্রুত ও নির্ভুল ধারণা পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ভবিষ্যতের রোবট বা অটোনমাস গাড়িকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে যানবাহন শুধু কম্পিউটারের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব গতিবিধি ব্যবহার করেও পরিবেশ বিশ্লেষণ করতে পারবে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং শক্তি সাশ্রয় হবে।
‘স্কুল অফ বায়োসায়েন্সেস’-এর অধ্যাপক মিক্কো জুসোলা বলেছেন, “আমাদের এ গবেষণাটি মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে সে সম্পর্কে প্রচলিত চিন্তাধারায় এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।”
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, কোনো পতঙ্গ দ্রুত মোড় নেওয়ার সময় তাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও উচ্চগতির কার্যক্রমে চলে যায়। এর ফলে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ওপর বেশি মনোযোগ দিতে পারে এবং বিপদের মুহূর্তেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।
গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক জুসোলা বলেছেন, “আমরা দেখেছি, অতি ক্ষুদ্র বিভিন্ন মস্তিষ্কও কীভাবে বিস্ময়কর গতিতে জটিল সব সমস্যার সমাধান করতে পারে।”
গবেষক ড. জৌনি তাকালো জানিয়েছেন, এ ধরনের অভিযোজনক্ষম তথ্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি ভবিষ্যতের এআই, রোবোটিক্স ও রিয়েল-টাইম সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
তিনি বলেছেন, “আমাদের এ প্রাপ্তি স্নায়বিক প্রক্রিয়াকরণের প্রচলিত বিভিন্ন মডেলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, যেখানে মনে করা হত তথ্য নির্দিষ্ট পথে চলে এবং এর মধ্যে কিছু সহজাত বিলম্ব থাকেই।
“এর পরিবর্তে, আমাদের ফলাফল নতুন এক কাঠামোর পথ দেখাচ্ছে, যেখানে দৃষ্টিশক্তি হচ্ছে পতঙ্গের নড়াচড়া, তার দেখার ইনপুট ও মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ার সমন্বিত এক প্রচেষ্টা।”
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ।
সিএ/এমআর


