ইসলামের ইতিহাসে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির নাম সাধারণত ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্যের জন্য স্মরণ করা হয়। তবে তাঁর শাসনামলে যে বিস্তৃত শিক্ষা সংস্কার এবং সুন্নি শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন ঘটেছিল, সেটিও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ আইয়ুবি শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
ফাতেমীয় শিয়া খেলাফতের দীর্ঘ প্রায় দুই শতকের শাসনের পর মিসরে সুন্নি ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে নতুন প্রজন্মের আলেম, বিচারক, ফকিহ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা তৈরি হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আইয়ুবি শাসকেরা শিক্ষানীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেন।
মিসরীয় ইতিহাসবিদ আল-মাকরিজির বর্ণনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় আসার পর সালাহউদ্দিন কায়রো, দামেস্ক ও আলেপ্পোসহ বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিকভাবে সুন্নি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি সিরিয়ার শাসক নুরুদ্দিন জেনকির শিক্ষা সংস্কার থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। একই সময়ে কায়রোর আল-আজহারে জুমার নামাজ ও শিয়া ধর্মীয় কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশক পর মামলুক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স ৬৬৫ হিজরিতে আল-আজহারকে পুনরায় সক্রিয় করে সুন্নি শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্রে রূপান্তরে ভূমিকা রাখেন।
আইয়ুবি আমলে প্রতিষ্ঠিত বহু মাদ্রাসার অর্থায়ন করা হতো ওয়াক্ফকৃত কৃষিজমির আয় থেকে। বিশেষ করে ফাইয়ুম অঞ্চলের কৃষিজমি থেকে উৎপাদিত গম বিক্রির অর্থ দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ব্যয় নির্বাহ করা হতো। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান রাজকোষের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে একটি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হতো।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, শুধু কায়রো ও ফুস্তাত এলাকাতেই আইয়ুবি আমলে ২০টির বেশি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও সময়ের প্রবাহে অধিকাংশ স্থাপনা বিলুপ্ত হয়েছে, তবুও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল।
আল-মাদ্রাসাতুল কামহিয়্যা ছিল মালেকি মাজহাবের শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। ‘কামহুন’ শব্দের অর্থ গম। গম উৎপাদনকারী ওয়াক্ফ জমির আয় থেকেই প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় পরিচালিত হওয়ায় এর নামকরণ হয়েছিল এইভাবে। আমর ইবনুল আসের মসজিদের পাশে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসা পরে আরও ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করে, যখন মামলুক যুগে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনকে এর প্রধান শাইখ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আল-মাদ্রাসাতুন নাসিরিয়্যাহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইমাম শাফেয়ির মাজারের পাশে। শাফেয়ি ফিকহ শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা সে সময় রাজকীয়ভাবে প্রতি মাসে ৪০টি স্বর্ণদিনার ভাতা পেতেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
আল-মাদ্রাসাতুস সালাহিয়্যা সে সময়ের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। পাঠ্যক্রমের গভীরতা ও শিক্ষার মানের কারণে ইমাম জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতি একে ‘তাজুল মাদারিস’ বা সকল মাদ্রাসার মুকুট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে সালাহউদ্দিনের প্রভাবশালী উজির কাজি আল-ফাদেলের প্রতিষ্ঠিত আল-মাদ্রাসাতুল ফাজেলিয়্যাও বিশেষভাবে পরিচিতি পায়। এখানে ইমাম শাতিবি কোরআন ও তাজবিদ শিক্ষা দিতেন এবং তাঁর পাঠদান সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
আইয়ুবি আমলের প্রথম দিকে প্রতিটি মাদ্রাসা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মাজহাবের অনুসারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হতো। তবে পরবর্তী সময়ে চার মাজহাবকে একই প্রতিষ্ঠানের আওতায় শিক্ষাদানের ধারণা গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আইয়ুবি বংশের শেষ দিকের শাসক আল-মালিকুস সালেহ নাজমুদ্দিন আইয়ুব ১২৪২-৪৩ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোর বাইনাল কাসরাইন এলাকায় আল-মাদ্রাসাতুস সালিহিয়্যা প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই মিসরের প্রথম মাদ্রাসা, যেখানে হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—চার মাজহাবের শিক্ষা একই ছাদের নিচে পৃথক ইওয়ানে পরিচালিত হতো।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক—উভয় উদ্দেশ্যই কাজ করেছিল। চার মাজহাবকে সমান মর্যাদা দেওয়ার মাধ্যমে মতপার্থক্য কমানো এবং সুন্নি সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তী মামলুক যুগে চার মাজহাবের জন্য পৃথক প্রধান বিচারক নিয়োগের রীতিও চালু হয়।
এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম খ্যাতিমান শিক্ষক ছিলেন ইমাম আল-ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদুস সালাম। দামেস্ক থেকে আগত এই আইনবিদকে সমসাময়িকরা ‘সুলতানুল উলামা’ নামে সম্মানিত করতেন।
আইয়ুবি যুগের শিক্ষাব্যবস্থায় বর্তমান ডিগ্রির পরিবর্তে ‘আল-ইজাজা’ ছিল জ্ঞান অর্জনের স্বীকৃতি। এটি ছিল শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও পাঠদানের অনুমোদন। আনুষ্ঠানিক লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জ্ঞানগত সম্পর্ক ও ধারাবাহিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতো।
এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক আলেমের জন্য নিজের শিক্ষাগুরু এবং জ্ঞানচর্চার পরম্পরা জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, জ্ঞানের বৈধতা নির্ভর করত শিক্ষক থেকে ছাত্রের কাছে ধারাবাহিকভাবে সেই জ্ঞান পৌঁছানোর ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, আইয়ুবি শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ওয়াক্ফভিত্তিক অর্থায়ন। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছিল। সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরি এবং পরবর্তীকালে মামলুক শাসকেরাও এই প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হন। আজও কায়রোর আল-মুইজ সড়কে সালিহিয়্যার ধ্বংসাবশেষ সেই শিক্ষা আন্দোলনের স্মৃতি বহন করছে।


