ইসলামের ইতিহাসে বর্তমানে হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—এই চার মাজহাবই সবচেয়ে পরিচিত। তবে ইসলামি ফিকহের প্রাথমিক যুগে আরও অনেক সুসংগঠিত মাজহাবের অস্তিত্ব ছিল। সময়ের প্রবাহে নানা ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণে সেসব মাজহাব ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে তাদের গবেষণা, মতামত ও ইজতিহাদি চিন্তাধারা ইসলামি জ্ঞানভান্ডারে এখনও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
ইসলামি গবেষক ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি উল্লেখ করেছেন, হিজরি পঞ্চম শতকের আগ পর্যন্ত অন্তত দশটি সুসংগঠিত মাজহাব সক্রিয় ছিল। সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের অনেক বিশিষ্ট আলেম বিভিন্ন ফিকহি বিষয়ে নিজস্ব ইজতিহাদি মতামত প্রদান করেছিলেন। (সুয়ুতি, আল-হাভি লিল-ফাতাওয়ি, কায়রো, পৃ. ৩১২)
ইসলামের দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরি শতকে ইজতিহাদ বা স্বাধীন গবেষণাভিত্তিক ফিকহচর্চা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সে সময় বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা আলাদা ফিকহি ধারা গড়ে ওঠে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে অনেক ধারাই ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
ইমাম আওজায়ির মাজহাব
আবদুর রহমান ইবনে আমর আল-আওজায়ি ছিলেন সিরিয়া ও লেবাননের অন্যতম প্রভাবশালী ফকিহ। সমকালীন অনেক আলেম তাঁর জ্ঞান ও ফিকহি প্রজ্ঞার উচ্চ প্রশংসা করেছেন। ইমাম মালিকও কিছু ক্ষেত্রে তাঁর মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। (ইবনে আবি জুরআ আদ-দিমাশকি, তারিখু আবি জুরআ আদ-দিমাশকি, পৃ. ১৪)
তিনি শাসকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন। আব্বাসীয় সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে আলি যখন সিরিয়ায় উমাইয়া বংশের সদস্যদের হত্যা শুরু করেন, তখন আওজায়ি প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেন। অমুসলিমদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিবাদ জানান।
দীর্ঘ সময় সিরিয়া ও আন্দালুসে তাঁর মাজহাব অনুসৃত হলেও পরে স্পেনে মালিকি মাজহাবকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁর রচনাগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মাধ্যমে যথাযথভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় এই মাজহাব ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ইমাম লাইস ইবনে সাদের মাজহাব
মিসরের প্রখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস লাইস ইবনে সাদ তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইমাম শাফেয়ি তাঁর জ্ঞানের গভীরতার প্রশংসা করে মন্তব্য করেছিলেন যে, লাইস ইবনে সাদ ছিলেন ইমাম মালিকের চেয়েও সূক্ষ্ম ফকিহ। (আবুশ শাইখ আল-আসফাহানি, তাবাকাতুল মুহাদ্দিসিন বি-আসফাহান, ২/১৫)
তিনি নিজের রচনাগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তাঁর শিষ্যরা নতুন নতুন ফিকহি সমস্যার সমাধানে সেই নীতিগুলো প্রয়োগ করে মাজহাবকে সম্প্রসারণ করতে পারেননি। ফলে ধীরে ধীরে এই ধারার অনুসারী কমে যায় এবং একসময় তা বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।
ইমাম তাবারির মাজহাব
বিশ্ববিখ্যাত তাফসিরকার আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি শুধু মুফাসসিরই ছিলেন না, তিনি একজন স্বাধীন মুজতাহিদও ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত জারিরি মাজহাব একসময় বাগদাদে উল্লেখযোগ্য অনুসারী লাভ করেছিল।
তবে কিছু ফিকহি বিষয়ে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সঙ্গে মতভেদের জেরে তিনি তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং জীবনের শেষ সময়ে কার্যত গৃহবন্দী অবস্থায় থাকতে হয়। এমনকি মৃত্যুর পরও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় রাতে নিজ বাড়িতেই তাঁকে দাফন করা হয়। এই পরিস্থিতি তাঁর মাজহাবের ধারাবাহিকতা নষ্ট করে দেয়।
সুফিয়ান সাওরি ও আবু সাওরের মাজহাব
কুফার বিখ্যাত আলেম সুফিয়ান সাওরি স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের দেওয়া বিচারপতির পদ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং রাজনৈতিক চাপ এড়াতে জীবনের শেষাংশ আত্মগোপনে কাটান। ফলে তাঁর ফিকহি চিন্তাধারাকে ঘিরে শক্তিশালী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
অন্যদিকে আবু সাওর আল-বাগদাদি, যিনি ইমাম শাফেয়ির শিষ্য ছিলেন, পরবর্তীতে নিজস্ব ফিকহি ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মাজহাব ককেশাস অঞ্চলে কিছুদিন প্রচলিত থাকলেও সংগঠিতভাবে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
জাহিরি মাজহাব
বিলুপ্ত মাজহাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় টিকে ছিল জাহিরি মাজহাব। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দাউদ ইবনে আলি আল-আসফাহানি। এই মাজহাবে কিয়াসের পরিবর্তে কোরআন ও সুন্নাহর সরাসরি ও বাহ্যিক অর্থকে গুরুত্ব দেওয়া হতো।
স্পেনের বিখ্যাত আলেম ইমাম ইবনে হাজাম আন্দালুসি এই মাজহাবকে শক্তিশালী ভিত্তি দেন। তাঁর আল-মুহাল্লা ও আল-ইহকাম গ্রন্থ দুটি আজও তুলনামূলক ফিকহ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে ইবনে হাজামের কঠোর সমালোচনামূলক লেখনিশৈলীর কারণে সমসাময়িক অনেক আলেমের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। পরবর্তীতে উত্তর আফ্রিকার কিছু শাসক তাঁর গ্রন্থ নিষিদ্ধ করেন। এর ফলে জাহিরি মাজহাবও সংগঠিতভাবে টিকে থাকতে পারেনি।
মাজহাব বিলুপ্তির প্রধান কারণ
ইসলামি ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাজহাবগুলোর বিলুপ্তির পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করেছে।
প্রথমত, প্রতিষ্ঠাতাদের মতামতকে লিখিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগীভাবে বিস্তৃত করার অভাব।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক। আব্বাসীয় ও উসমানীয় আমলে হানাফি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে শাফেয়ি মাজহাব সরকারি সমর্থন পাওয়ায় সেগুলো দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সামাজিক বিরোধ এবং মতভেদের কারণে অনেক আলেম ও তাঁদের অনুসারীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টিকে থাকতে পারেননি।
তবে এসব মাজহাব সংগঠিতভাবে বিলুপ্ত হলেও তাদের ফিকহি মতামত সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি। ইমাম ইবনে রুশদের বিদায়াতুল মুজতাহিদ এবং ইবনে কুদামার আল-মুগনির মতো তুলনামূলক ফিকহের গ্রন্থে এসব মাজহাবের বহু মতামত সংরক্ষিত রয়েছে। আধুনিক ইসলামি গবেষকরাও আজ বিভিন্ন গবেষণায় সেই ঐতিহাসিক মতামত ব্যবহার করে থাকেন।
সিএ/এমআর


