হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আরব উপদ্বীপে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। সেই সময় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের দাওয়াত বিশ্বপরিসরে পৌঁছে দিতে এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি সমকালীন বিশ্বের বিভিন্ন সম্রাট, রাজা ও আঞ্চলিক শাসকদের কাছে দূতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সে সময়ের শাসকেরা সিলমোহর ছাড়া কোনো চিঠি গ্রহণ করতেন না। এ কারণে মহানবী (সা.) রুপার একটি আংটি তৈরি করান, যাতে ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ লেখা ছিল। সেই সিলমোহর ব্যবহার করেই বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়।
হাবশার শাসক নাজাশির কাছে পাঠানো চিঠিগুলো ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মক্কা যুগে নির্যাতনের মুখে মুসলমানদের হাবশায় আশ্রয় দেওয়ার জন্য নাজাশি পরিচিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে পাঠানো চিঠি তিনি সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, তিনি ইসলামের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন।
মিসরের শাসক মোকাওকিসের কাছেও একটি আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠানো হয়। তিনি ইসলাম গ্রহণ না করলেও মহানবীর বার্তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং দূতের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন উপহারও পাঠান।
পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের কাছে পাঠানো চিঠির প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, তিনি চিঠিটি ছিঁড়ে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সাম্রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয় এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার শুরু হয়।
রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে পাঠানো চিঠিও ইতিহাসে ব্যাপক আলোচিত। মহানবী (সা.) সম্পর্কে তথ্য জানার জন্য তিনি অনুসন্ধান চালান এবং বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে তাঁর সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবু দূতের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেছিলেন বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া বাহরাইনের শাসক মুনজির ইবনে সাবি, ইয়ামামার শাসক হাওজা ইবনে আলি, দামেশকের শাসক হারিস গাসসানি এবং আম্মানের দুই শাসক জায়ফর ও আবদের কাছেও পৃথকভাবে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কেউ ইসলাম গ্রহণ করেন, কেউ প্রত্যাখ্যান করেন এবং কেউ রাজনৈতিক শর্ত আরোপের চেষ্টা করেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই চিঠিগুলো শুধু ধর্মীয় আহ্বানই ছিল না, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শান্তিপূর্ণ বার্তা ও সংলাপের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতি ও রাষ্ট্রের কাছে ইসলামের পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
সিএ/এমআর


