ব্যবস্থাপনায় তাদের অবদান তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, আধুনিক ব্যাংকিং, চেক ব্যবস্থা এবং দূরবর্তী অর্থ স্থানান্তরের মতো ধারণার ভিত্তি বহু শতাব্দী আগে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রে গড়ে উঠেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামি সভ্যতায় আর্থিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)–এর শাসনামলে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিষ্ঠিত বায়তুল মাল ছিল সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। জাকাত, খারাজ, উশর এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত সম্পদ পরিচালনার মাধ্যমে এটি সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্পদের পুনর্বণ্টনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
পরবর্তীতে আব্বাসীয় খিলাফতের সময় বাগদাদ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তখন “সাররাফ” ও “জাহবাধ” নামে পরিচিত পেশাদার অর্থব্যবস্থাপকরা আমানত গ্রহণ, মুদ্রা বিনিময়, ঋণ প্রদান এবং দূরবর্তী অর্থ স্থানান্তরের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। গবেষকদের মতে, এসব কার্যক্রম আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ।
মধ্যযুগীয় ইসলামি অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনের মধ্যে ছিল “সাক” এবং “সুফতাজা”। সাক ছিল লিখিত অর্থপ্রদানের একটি দলিল, যা আধুনিক চেকের পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে সুফতাজা ছিল দূরবর্তী অঞ্চলে নিরাপদে অর্থ স্থানান্তরের একটি ব্যবস্থা, যা বর্তমানের বিল অব এক্সচেঞ্জ বা লেটার অব ক্রেডিটের সঙ্গে তুলনীয়।
ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় বণিকেরা মুসলিম বিশ্বের এই আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হন। পরে ভেনিস, জেনোয়া ও ফ্লোরেন্সের মতো বাণিজ্যকেন্দ্রে অনুরূপ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা আধুনিক ইউরোপীয় ব্যাংকিংয়ের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানের ডিজিটাল ব্যাংকিং, অনলাইন ট্রান্সফার, ফিনটেক কিংবা ব্লকচেইনভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার মূল দর্শনও বিশ্বাস, তথ্য ও রেকর্ডভিত্তিক লেনদেনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শত শত বছর আগে মুসলিম বিশ্বের সাক ও সুফতাজা ব্যবস্থায় সেই ধারণার কার্যকর প্রয়োগ দেখা গিয়েছিল।


