মানুষের অন্তরে যখন মহান আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্ম নেয়, তখন তার ভেতরে সৃষ্টি হয় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক অনুভূতি। ইসলামী পরিভাষায় একে বলা হয় ‘শওক’—অর্থাৎ আল্লাহর সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্য লাভের প্রবল আকাঙ্ক্ষা। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই অনুভূতি কেবল সেইসব মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেয়, যাদের অন্তর ঈমান, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষাকে আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি উল্লেখ করেছেন, আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই এ ধরনের ব্যাকুলতার জন্ম হয়। মহানবী (সা.) নিজেও আল্লাহর কাছে এই মর্যাদা কামনা করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আপনার সাক্ষাতের আনন্দ এবং আপনার সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতা প্রার্থনা করছি।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৩২৫)
ইসলামী শিক্ষায় বলা হয়, এই ব্যাকুলতা অর্জনের অন্যতম ভিত্তি হলো ‘মারেফাত’ বা আল্লাহকে যথাযথভাবে চেনা। যখন একজন মুমিন আল্লাহর নিয়ামত, কুদরত ও রহমত সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি অর্জন করেন, তখন জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি আল্লাহর অনুগ্রহ দেখতে পান। এর ফলে তাঁর হৃদয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভালোবাসা আরও দৃঢ় হয়।
মৃত্যুকে সাধারণ মানুষ যেখানে বিচ্ছেদ বা ভয় হিসেবে দেখে, সেখানে আল্লাহর নৈকট্যপ্রত্যাশী বান্দারা একে প্রভুর কাছে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। মৃত্যুশয্যায় হজরত বেলাল (রা.)-এর আনন্দঘন প্রতিক্রিয়া সেই অনুভূতিরই প্রতিফলন। তিনি বলেছিলেন, ‘আহা, কী আনন্দ, কালই আমি আমার প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হব—নবীজি ও তাঁর দলের সঙ্গে।’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
ইমাম ইবনুল কাইয়িমের মতে, আল্লাহর সান্নিধ্যের এই আকাঙ্ক্ষা প্রকৃত ভালোবাসারই ফল। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তি লাভ করে এবং তাঁর সন্তুষ্টির মধ্যেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। এমন মানুষদের হৃদয় জান্নাতে আল্লাহর দর্শন লাভের আশা নিয়ে সদা উদগ্রীব থাকে।
কোরআনে বর্ণিত নবী ইউসুফ (আ.)-এর জীবনেও এ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা যায়। জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সম্মান, ক্ষমতা ও পারিবারিক পুনর্মিলনের পর তিনি মহান আল্লাহর কাছে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার এবং মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণের প্রার্থনা করেছিলেন। ইসলামী চিন্তাবিদরা এটিকে দুনিয়ার সাফল্যের চেয়ে আখিরাতের সফলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আল্লাহর প্রেমে উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিরা নির্জনতাকেও মূল্য দেন। কারণ একান্ত পরিবেশে ইবাদত, জিকির, মোনাজাত ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে তাঁরা সৃষ্টিকর্তার আরও নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন ইসলামী মনীষীর জীবনীতে এ ধরনের নির্জন সাধনার অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়।
সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর জীবনের শেষ মুহূর্তও ছিল আখিরাতমুখী চিন্তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি জানেন যে আমি দুনিয়াকে ভালোবাসিনি নদী খনন করতে বা গাছ লাগাতে; বরং আমি দুনিয়াতে বেঁচে থাকতে চেয়েছি গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে তৃষ্ণার্ত থেকে রোজা রাখতে, রাতের দীর্ঘ ইবাদতের কষ্ট সহ্য করতে আর ইলমের মজলিসে আলেমদের সান্নিধ্যে হাঁটু গেড়ে বসতে।’
ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, একজন মুমিন দুনিয়াকে চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং পরকালের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই তাঁর প্রতিটি দিন ও রাত ইবাদত, সৎকর্ম এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে কাটানোর চেষ্টা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মার যত্ন ও পরিশুদ্ধির প্রতি যত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সান্নিধ্যের আকাঙ্ক্ষা তত গভীর হয়। অন্যদিকে অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস ও পার্থিব মোহ মানুষের আত্মিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। আল্লাহর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষাই একজন মুমিনকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং ইবাদতে প্রশান্তি এনে দেয়।
সিএ/এমআর


