Sunday, August 2, 2026
29.1 C
Dhaka
No menu items!

শৈশবেই ধর্মীয় ভিত্তি গড়ে তোলার গুরুত্ব

সকালে অনেক অভিভাবকই এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হন, যা শুনে তারা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। সাত–আট বছরের একটি শিশু হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসে, মা, আল্লাহ কোথায়? আমি কেন তাঁকে দেখতে পাই না? এই স্বাভাবিক কৌতূহল থেকেই শুরু হয় বিশ্বাস, যুক্তি আর অনুভূতির এক গভীর আলোচনা।

অনেক সময় অভিভাবকেরা বাতাস বা অক্সিজেনের উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চান যে সব কিছু দেখা যায় না, তবু সেগুলো থাকে। কিন্তু বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে ওঠা শিশুরা কেবল এমন সহজ তুলনায় সন্তুষ্ট হয় না। তারা যুক্তিভিত্তিক ব্যাখ্যা খোঁজে এবং প্রশ্নের পেছনের কারণ বুঝতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কেবল তথ্য দেওয়া নয়, বরং তার হৃদয়ে বিশ্বাসের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করার প্রক্রিয়া। এই পরিচয়ের সূচনা হওয়া উচিত শৈশব থেকেই, যখন শিশুর মন সবচেয়ে বেশি গ্রহণক্ষম থাকে।

ইসলামি জীবনদর্শনে সাত বছর বয়স থেকে নামাজের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হলেও আল্লাহর পরিচয় তারও আগে শিশুর অন্তরে গেঁথে দেওয়া জরুরি। এক থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে অভ্যাসের মাধ্যমে শিক্ষা বেশি কার্যকর। খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলা, শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা কিংবা বৃষ্টির শব্দ শুনে সুবহানাল্লাহ বলা—এই ছোট অভ্যাসগুলো শিশুর অবচেতন মনে আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আচরণগত শিক্ষার গুরুত্বও এখানে বড়। শিশুরা যা শোনে তার চেয়ে বেশি শেখে যা দেখে। অভিভাবকেরা যখন দোয়া করেন বা জিকির করেন, তখন শিশুরা তা অনুকরণ করতে চায়। এতে তাদের মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে আমাদের জীবনের সঙ্গে এমন একজন সত্তার সম্পর্ক আছে, যার কাছে আমরা সাহায্য চাই।

ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর আইয়্যুহাল ওয়ালাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শৈশব হলো কাদা মাটির মতো, এই সময়ে শিশুকে যেভাবে গঠন করা হবে, সেভাবেই তার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে।

যখন শিশু সরাসরি জানতে চায় কেন সে আল্লাহকে দেখতে পায় না, তখন বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। প্রথমত, স্রষ্টা ও সৃষ্টির উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, এই যে টেলিভিশন বা গাড়িগুলো দেখা যায়, এগুলো কি নিজে নিজে তৈরি হয়েছে? না, এগুলোর নির্মাতা আছে। তেমনি এই বিশাল পৃথিবী, সূর্য এবং তারকারাজিও কেউ একজন তৈরি করেছেন। আমরা সবসময় নির্মাতাকে দেখি না, কিন্তু তাঁর তৈরি কাজ দেখে বুঝি যে তিনি আছেন।

দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক ও অদৃশ্যের যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায় যে আমরা রাস্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা দেখি, কিন্তু যারা সেই ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের সবসময় চোখে দেখি না। তবু আমরা জানি কেউ একজন পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। একইভাবে আল্লাহ তাআলা আমাদের দেখেন এবং মহাবিশ্ব পরিচালনা করেন, যদিও আমরা তাঁকে এই চোখে দেখতে পাই না।

তৃতীয়ত, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিশুকে বোঝানো জরুরি। আমরা খুব দূরের জিনিস দেখি না, আবার খুব ছোট জীবাণুও দেখতে পাই না। আল্লাহ এত মহান এবং তাঁর নূর এত প্রখর যে এই দুনিয়ার চোখ দিয়ে তাঁকে দেখার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে জান্নাতে ইনশাআল্লাহ মুমিনরা আল্লাহকে দেখতে পাবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ত করেন। সুরা আনআম, আয়াত: ১০৩।

শিশুর আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য পরিবারে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে জামাতে নামাজ হলে শিশুকে আজান বা ইকামতের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। সাত বছর বয়স হলে প্রয়োজনীয় সুরা জানা থাকলে মাঝে মাঝে তাকে ইমামতি করার সুযোগ দিলে তার মধ্যে ধর্মীয় আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

গল্পের ছলে শিক্ষা দেওয়াও কার্যকর পদ্ধতি। শোয়ার আগে নবী-রাসুলদের জীবনের ঘটনা বা কোরআনের শিক্ষামূলক কাহিনি শোনালে শিশু সহজেই তা গ্রহণ করে। বর্তমানে অ্যানিমেটেড ইসলামিক ভিডিওও পাওয়া যায়, যা পরিবারসহ দেখা যেতে পারে, তবে দেখার পর শিশুকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া এবং ধৈর্য ধরে উত্তর দেওয়াও জরুরি।

সমবয়সী শিশুদের নিয়ে ছোট পরিসরে পাঠচক্র বা হালাকা গড়ে তোলা হলে সেখানে ফেরেশতা, আখলাক এবং নবীদের জীবন নিয়ে আলোচনা করা যায়। সমবয়সীদের সঙ্গে আলোচনা করলে শেখার আগ্রহ আরও বাড়ে।

আল্লাহর রাসুল (সা.) শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) যখন ছোট ছিলেন, তখন নবীজি (সা.) তাকে বলেছিলেন, হে বৎস, তুমি আল্লাহর হুকুম রক্ষা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শিশুদের গভীর আধ্যাত্মিক বিষয়ও সহজ ভাষায় শেখানো সম্ভব। তবে স্কুল বা বাইরের পরিবেশ থেকে তারা অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়েও আসতে পারে। তখন বিরক্ত না হয়ে তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং যুক্তির মাধ্যমে সংশয় দূর করা জরুরি।

বিশ্বাসের পথে শিশুকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধৈর্য ও মমতা। কৌতূহল দমিয়ে না রেখে প্রজ্ঞার সঙ্গে তাকে পরিচালনা করাই অভিভাবকের দায়িত্ব। যখন শিশু বুঝতে শেখে যে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং সবসময় তার সঙ্গে আছেন, তখন তার মনে নিরাপত্তা ও শান্তির অনুভূতি তৈরি হয়।

অভিভাবক হিসেবে সন্তানের জন্য আল্লাহর সঙ্গে গভীর ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার পথ তৈরি করে দেওয়াই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) বলেছেন, সন্তানের হৃদয়ে স্রষ্টার ভালোবাসা প্রোথিত করাই হলো সর্বোত্তম উত্তরাধিকার।

সিএ/এমআর

spot_img

আরও পড়ুন

জিকিরে বাড়ে মানসিক দৃঢ়তা, প্রশান্ত হয় হৃদয়

মানুষকে আল্লাহ তাআলা স্বভাবগতভাবেই দুর্বল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। শারীরিক...

চট্টগ্রামে বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি, পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখের বেশি মানুষ

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন...

২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীরে কী ঘটে? জানালেন বিশেষজ্ঞরা

টানা ২৪ ঘণ্টা উপবাস বা না খেয়ে থাকা সাম্প্রতিক...

মানসিক চাপ কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বর্তমান ব্যস্ত জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ অনেকের কাছেই নিত্যদিনের সঙ্গী।...

সিলেটে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করল উবার

অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবাকে আরও বিস্তৃত করতে সিলেটে পূর্ণাঙ্গ...

মহাকাশে আধিপত্যের নতুন প্রতিযোগিতা, মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

বিশ্বরাজনীতি, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের পর এবার মহাকাশকে কেন্দ্র করে...

বাড়িতেই তৈরি করুন সুস্বাদু চিংড়ি সমুচা

বিকেলের নাস্তা, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় সমুচা জনপ্রিয়...

পাকা আম দিয়ে সহজেই তৈরি করুন সুস্বাদু পোয়া পিঠা

গ্রীষ্মের মৌসুমে পাকা আম দিয়ে নানা ধরনের মিষ্টান্ন ও...

৮১০০ এমএএইচ ব্যাটারির ভিভো ওয়াই৫০০ আসছে, এক চার্জে ৩৫ ঘণ্টা ভিডিও দেখার দাবি

বাংলাদেশের বাজারে নতুন ব্যাটারিকেন্দ্রিক স্মার্টফোন ‘ভিভো ওয়াই৫০০’ আনার ঘোষণা...

প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি, যেসব লক্ষণ ও করণীয় জানা জরুরি

তীব্র গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ...

র‍্যামের দাম কমেছে, বেড়েছে পোর্টেবল হার্ডডিস্কের মূল্য

চলতি সপ্তাহে ঢাকার কম্পিউটার বাজারে র‍্যামের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন...

অটোইমিউন রোগের যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়

বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষ বিভিন্ন ধরনের অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হলেও...

বিত্তবান হয়েও কেন মানুষ অসুখী? অল্পে তুষ্টির শিক্ষা নিয়ে যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

শৈশবের একটি স্মৃতি তুলে ধরে বর্তমান সমাজে বৈষয়িকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা...
spot_img

আরও পড়ুন

জিকিরে বাড়ে মানসিক দৃঢ়তা, প্রশান্ত হয় হৃদয়

মানুষকে আল্লাহ তাআলা স্বভাবগতভাবেই দুর্বল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি মানসিক দুর্বলতাও মানুষের জীবনের একটি বাস্তবতা। দুঃখ, উদ্বেগ, সংকট কিংবা অনিশ্চয়তার মুহূর্তে মানুষ...

চট্টগ্রামে বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি, পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখের বেশি মানুষ

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ...

২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীরে কী ঘটে? জানালেন বিশেষজ্ঞরা

টানা ২৪ ঘণ্টা উপবাস বা না খেয়ে থাকা সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে বেশ আলোচিত একটি অভ্যাস। অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট সময় খাবার থেকে...

মানসিক চাপ কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বর্তমান ব্যস্ত জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ অনেকের কাছেই নিত্যদিনের সঙ্গী। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে...
spot_img