Monday, April 20, 2026
34 C
Dhaka

শৈশবেই ধর্মীয় ভিত্তি গড়ে তোলার গুরুত্ব

সকালে অনেক অভিভাবকই এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হন, যা শুনে তারা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। সাত–আট বছরের একটি শিশু হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসে, মা, আল্লাহ কোথায়? আমি কেন তাঁকে দেখতে পাই না? এই স্বাভাবিক কৌতূহল থেকেই শুরু হয় বিশ্বাস, যুক্তি আর অনুভূতির এক গভীর আলোচনা।

অনেক সময় অভিভাবকেরা বাতাস বা অক্সিজেনের উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চান যে সব কিছু দেখা যায় না, তবু সেগুলো থাকে। কিন্তু বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে ওঠা শিশুরা কেবল এমন সহজ তুলনায় সন্তুষ্ট হয় না। তারা যুক্তিভিত্তিক ব্যাখ্যা খোঁজে এবং প্রশ্নের পেছনের কারণ বুঝতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কেবল তথ্য দেওয়া নয়, বরং তার হৃদয়ে বিশ্বাসের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করার প্রক্রিয়া। এই পরিচয়ের সূচনা হওয়া উচিত শৈশব থেকেই, যখন শিশুর মন সবচেয়ে বেশি গ্রহণক্ষম থাকে।

ইসলামি জীবনদর্শনে সাত বছর বয়স থেকে নামাজের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হলেও আল্লাহর পরিচয় তারও আগে শিশুর অন্তরে গেঁথে দেওয়া জরুরি। এক থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে অভ্যাসের মাধ্যমে শিক্ষা বেশি কার্যকর। খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলা, শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা কিংবা বৃষ্টির শব্দ শুনে সুবহানাল্লাহ বলা—এই ছোট অভ্যাসগুলো শিশুর অবচেতন মনে আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আচরণগত শিক্ষার গুরুত্বও এখানে বড়। শিশুরা যা শোনে তার চেয়ে বেশি শেখে যা দেখে। অভিভাবকেরা যখন দোয়া করেন বা জিকির করেন, তখন শিশুরা তা অনুকরণ করতে চায়। এতে তাদের মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে আমাদের জীবনের সঙ্গে এমন একজন সত্তার সম্পর্ক আছে, যার কাছে আমরা সাহায্য চাই।

ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর আইয়্যুহাল ওয়ালাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শৈশব হলো কাদা মাটির মতো, এই সময়ে শিশুকে যেভাবে গঠন করা হবে, সেভাবেই তার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে।

যখন শিশু সরাসরি জানতে চায় কেন সে আল্লাহকে দেখতে পায় না, তখন বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। প্রথমত, স্রষ্টা ও সৃষ্টির উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, এই যে টেলিভিশন বা গাড়িগুলো দেখা যায়, এগুলো কি নিজে নিজে তৈরি হয়েছে? না, এগুলোর নির্মাতা আছে। তেমনি এই বিশাল পৃথিবী, সূর্য এবং তারকারাজিও কেউ একজন তৈরি করেছেন। আমরা সবসময় নির্মাতাকে দেখি না, কিন্তু তাঁর তৈরি কাজ দেখে বুঝি যে তিনি আছেন।

দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক ও অদৃশ্যের যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায় যে আমরা রাস্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা দেখি, কিন্তু যারা সেই ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের সবসময় চোখে দেখি না। তবু আমরা জানি কেউ একজন পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। একইভাবে আল্লাহ তাআলা আমাদের দেখেন এবং মহাবিশ্ব পরিচালনা করেন, যদিও আমরা তাঁকে এই চোখে দেখতে পাই না।

তৃতীয়ত, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিশুকে বোঝানো জরুরি। আমরা খুব দূরের জিনিস দেখি না, আবার খুব ছোট জীবাণুও দেখতে পাই না। আল্লাহ এত মহান এবং তাঁর নূর এত প্রখর যে এই দুনিয়ার চোখ দিয়ে তাঁকে দেখার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে জান্নাতে ইনশাআল্লাহ মুমিনরা আল্লাহকে দেখতে পাবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ত করেন। সুরা আনআম, আয়াত: ১০৩।

শিশুর আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য পরিবারে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে জামাতে নামাজ হলে শিশুকে আজান বা ইকামতের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। সাত বছর বয়স হলে প্রয়োজনীয় সুরা জানা থাকলে মাঝে মাঝে তাকে ইমামতি করার সুযোগ দিলে তার মধ্যে ধর্মীয় আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

গল্পের ছলে শিক্ষা দেওয়াও কার্যকর পদ্ধতি। শোয়ার আগে নবী-রাসুলদের জীবনের ঘটনা বা কোরআনের শিক্ষামূলক কাহিনি শোনালে শিশু সহজেই তা গ্রহণ করে। বর্তমানে অ্যানিমেটেড ইসলামিক ভিডিওও পাওয়া যায়, যা পরিবারসহ দেখা যেতে পারে, তবে দেখার পর শিশুকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া এবং ধৈর্য ধরে উত্তর দেওয়াও জরুরি।

সমবয়সী শিশুদের নিয়ে ছোট পরিসরে পাঠচক্র বা হালাকা গড়ে তোলা হলে সেখানে ফেরেশতা, আখলাক এবং নবীদের জীবন নিয়ে আলোচনা করা যায়। সমবয়সীদের সঙ্গে আলোচনা করলে শেখার আগ্রহ আরও বাড়ে।

আল্লাহর রাসুল (সা.) শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) যখন ছোট ছিলেন, তখন নবীজি (সা.) তাকে বলেছিলেন, হে বৎস, তুমি আল্লাহর হুকুম রক্ষা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শিশুদের গভীর আধ্যাত্মিক বিষয়ও সহজ ভাষায় শেখানো সম্ভব। তবে স্কুল বা বাইরের পরিবেশ থেকে তারা অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়েও আসতে পারে। তখন বিরক্ত না হয়ে তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং যুক্তির মাধ্যমে সংশয় দূর করা জরুরি।

বিশ্বাসের পথে শিশুকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধৈর্য ও মমতা। কৌতূহল দমিয়ে না রেখে প্রজ্ঞার সঙ্গে তাকে পরিচালনা করাই অভিভাবকের দায়িত্ব। যখন শিশু বুঝতে শেখে যে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং সবসময় তার সঙ্গে আছেন, তখন তার মনে নিরাপত্তা ও শান্তির অনুভূতি তৈরি হয়।

অভিভাবক হিসেবে সন্তানের জন্য আল্লাহর সঙ্গে গভীর ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার পথ তৈরি করে দেওয়াই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) বলেছেন, সন্তানের হৃদয়ে স্রষ্টার ভালোবাসা প্রোথিত করাই হলো সর্বোত্তম উত্তরাধিকার।

সিএ/এমআর

spot_img

আরও পড়ুন

ময়লা পানি পরিশোধনের পর কি পবিত্র হয়, শরিয়তের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা

বিশ্বজুড়ে পানির সংকট মোকাবিলায় বর্জ্য পানি পুনঃব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।...

গরমে স্বস্তি পেতে বেলের শরবত বানানোর সহজ উপায়

গ্রীষ্মের দাবদাহে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে অনেকেই খোঁজেন প্রাকৃতিক পানীয়ের।...

আইফোনে বড় পরিবর্তন, আসছে শক্তিশালী ক্যামেরা প্রযুক্তি

প্রযুক্তি বাজারে ক্যামেরা সক্ষমতার দিক থেকে দীর্ঘদিন ধরেই শক্ত...

শরিয়তে দোয়া চাওয়ার বিধান

হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা ও মদিনায় যাত্রা করা ব্যক্তিদের...

প্রাক্তনের বিয়েতে যাওয়া কি মানসিক ঝুঁকি

প্রাক্তনের বিয়ের আমন্ত্রণ পাওয়া বা না পাওয়া—দুই ক্ষেত্রেই অনেকের...

বেসিস নির্বাচন জুনে, প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ তফসিল

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর ২০২৬-২০২৮...

অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব, কোরআনের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

কোরআনে বর্ণিত কারুনের ঘটনা শুধু ঐশ্বর্যের গল্প নয়, বরং...

গ্রামবাংলার পুরোনো খাবার পান্তার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব

পান্তাভাতকে অনেকে পয়লা বৈশাখের খাবার হিসেবে ভাবলেও বাস্তবে এটি...

হোয়াটসঅ্যাপ কলে আসছে নয়েজ ক্যান্সেলেশন সুবিধা

জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপ তাদের অডিও ও ভিডিও কলের...

ইতিহাসের প্রজ্ঞাবান সাহাবি মুগিরা ইবনে শুবা (রা.)

ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার জন্য সুপরিচিত এক...

মায়ের জিনে নির্ধারিত হয় সন্তানের অনেক বৈশিষ্ট্য

সন্তানের গঠনে মা ও বাবার জিন সমানভাবে ভূমিকা রাখলেও...

বিল উত্থাপনে জটিলতায় পড়লেন প্রতিমন্ত্রী নুর, স্পিকারের নির্দেশে পুনরায় উপস্থাপন

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিল উত্থাপন করতে গিয়ে কিছুটা জটিলতায়...

আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় আজ, ট্রাইব্যুনালে হাজির ৬ আসামি

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়...

জিনথেরাপিতে বধিরতার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে জিনথেরাপি। সাম্প্রতিক এক...
spot_img

আরও পড়ুন

ময়লা পানি পরিশোধনের পর কি পবিত্র হয়, শরিয়তের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা

বিশ্বজুড়ে পানির সংকট মোকাবিলায় বর্জ্য পানি পুনঃব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে ড্রেন বা ময়লা পানি পরিশোধন করে ব্যবহারের প্রশ্নে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী—তা নিয়ে আলেমদের...

গরমে স্বস্তি পেতে বেলের শরবত বানানোর সহজ উপায়

গ্রীষ্মের দাবদাহে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে অনেকেই খোঁজেন প্রাকৃতিক পানীয়ের। সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে বাড়িতেই তৈরি করা যায় বেলের শরবত, যা স্বাদ ও পুষ্টি—দুই দিক থেকেই...

আইফোনে বড় পরিবর্তন, আসছে শক্তিশালী ক্যামেরা প্রযুক্তি

প্রযুক্তি বাজারে ক্যামেরা সক্ষমতার দিক থেকে দীর্ঘদিন ধরেই শক্ত অবস্থানে রয়েছে আইফোন। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক নির্মাতা ইতিমধ্যে ২০০ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করলেও অ্যাপল...

শরিয়তে দোয়া চাওয়ার বিধান

হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা ও মদিনায় যাত্রা করা ব্যক্তিদের কাছে দোয়া চাওয়া এবং তাঁদের সহায়তায় অর্থ প্রদান সমাজে প্রচলিত একটি প্রথা। ইসলামি শরিয়তের আলোকে...
spot_img