Tuesday, June 30, 2026
28.7 C
Dhaka

বাহাদুর শাহ জাফরঃ মোঘল চলচিত্রের শেষ নায়ক

“উমর দরাজ মাঙ্গঁকে লায়েথে চার দিন
দো আরজুমে কাট গয়ে, দো ইন্তেজার মেঁ।”

বাংলায় অনুবাদ করলে অর্থ আসে “চার দিনের জন্য আয়ু নিয়ে এসেছিলাম। দু’টি কাটল প্রত্যাশায় আর দু’টি অপেক্ষায়।”
এই চরণ দুটি বাহাদুর শাহ জাফরের। শেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের কথাই বলছি। দিল্লির লাল কেল্লায় ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, সাম্রাজ্য হারিয়ে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় কবিতা লিখেই সময় কাটাতেন তিনি।

পিতার মৃত্যুর পর বাহাদুর শাহ ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন বাহাদুর শাহ। সিংহাসন তখন নামমাত্র চলছিলো। বাহাদুর শাহ এর পিতামহ এবং পিতা উভয়ই ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পেনশনভোগী।

তিনি নিজেও বার্ষিক এক লক্ষ টাকা ভাতা পেতেন। পিতার মতো বাহাদুর শাহ নিজের ও মুঘল খান্দানের ভরণপোষণে ভাতা বৃদ্ধির জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন।
বৃটিশ সরকার রাজি হয়েছিলো শর্ত দিয়ে। শর্ত ছিলো “বাদশাহ” উপাধি ত্যাগ করতে হবে আর লালকেল্লার বাইরে সাধারণ নাগরিকের মতো জীবনযাপন করতে হবে। এই শর্তে রাজি হননি বাহাদুর শাহ।

সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন নিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে সম্রাটের মনোমালিন্য হয়। সম্রাটের ক্ষমতা ও মর্যাদা নষ্ট করতে তৎপর হয় কোম্পানি। এ সময় বেদনা ভুলে থাকার জন্য সম্রাট গজল ও মুশায়েরায় নিমগ্ন থাকতেন ; লালকেল্লায় সাহিত্যের আসর বসিয়ে সময় কাটাতেন।
কেল্লায় অভ্যন্তরে ভালোই কাটছিলো দিন। সিংহাসনে বসার বিশ বছর পর্যন্ত সব চলছিলো একই রকম। হঠাৎই চিত্র পাল্টে গেলো ভারত বর্ষের। বিদ্রোহীর দানা বাঁধলো ব্যারাকে। সিপাহি বিদ্রোহের কথা বলছি। যারা ইতিহাস নিয়ে কখনই খোঁজ খবর রাখেন না তাদের কানেও নিশ্চয় এসেছে এই বিদ্রোহের কথা। সিপাহি বিদ্রোহ যখন শুরু হয় ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দমদম সেনাছাউনিতে।

আর ১১ই মে সিপাহিরা দিল্লি অধিকার করে এবং সেদিন তাঁরা লাল কেল্লায় প্রবেশ করে।
নামেমাত্র মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের স্বাধীন সম্রাট বলে ঘোষণা করে সিপাহিরা। সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নেয় তারা। এ দিন গভীর রাতে লালকেল্লায় একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে সম্রাটকে দেওয়ান-ই খানোস এ সম্মান জানানো হয়। সম্রাটের বয়স তখন ৮২ বছর।
সম্রাট নিজে এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভারতবর্ষে। বিদ্রোহ লাভ করে নতুন রূপ।
একের পর সেনাছাউনিতে বিদ্রোহ হতে থাকে।

‘খালক-ই খুদা, মুলক ই বাদশাহ, হুকুম ই সিপাহি’ স্লোগানে চলতে থাকে বিদ্রোহ। তবে ইংরেজরা অতি নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে। হাজার হাজার স্বাধীনতাকামীর রক্তে রঞ্জিত হয় ভারতবর্ষের মাটি। ইংরেজরা দিল্লি দখল করে নেয় এবং সম্রাট ২১ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। ইংরেজ সৈন্যরা মীর্জা মোগল, মীর্জা খিজির সুলতান, মীর্জা আবু বকরসহ ২৯ জন মুঘল শাহজাদাসহ বহু আমির ওমরাহ, সেনাপতি ও সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। সম্রাটকে বিচারের নামে প্রহসনের আদালতে দাঁড় করানো হয়। হাজির করা হয় বানোয়াট সাক্ষী। বিচারকরা রায় দেন, দিল্লির সাবেক সম্রাট ১০ মে থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠনের দায়ে অপরাধী। তার শাস্তি চরম অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। কিন্তু তার বার্ধক্যের কথা বিবেচনা করে প্রাণ দণ্ডাদেশ না নিয়ে নির্বাসনে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়।

রেঙ্গুনে পাঠানো হয় সম্রাটকে। ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিসের বাসভবনের ছোট গ্যারেজে সম্রাট ও তার পরিবার-পরিজনের বন্দিজীবন শুরু হয়। সম্রাটকে শুতে দেয়া হয় একটা পাটের দড়ির খাটিয়ায়। রেঙ্গুনেই ইতি ঘটে মোঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাটের। স্বদেশের ভূমিতে জায়গা হলো সম্রাটের। এই দুঃখে তিনি লিখেছিলেন, মরনেকে বাদ ইশক্ব মেরা বা আসর হুয়া উড়নে লাগি হ্যায় খাক মেরি ক্যোয়ি ইয়ার মে; কিৎনা বদনসিব জাফর দাফনকে লিয়ে দোগজ জামিন ভি মিলানা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে’

ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মায়ানমার সফরে গিয়ে তার সমাধি সৌধ পরিদর্শন করেন।সে সময় তিনি পরিদর্শক বইতে লিখেছিলেন –
“দু গজ জমিন তো না মিলি হিন্দুস্তান মে , পার তেরী কোরবানী সে উঠি আজাদী কি আওয়াজ, বদনসীব তো নাহি জাফর, জুড়া হ্যায় তেরা নাম ভারত শান আউর শওকত মে, আজাদী কি পয়গাম সে”।

১৭৭৫ সালের ২৪ শে অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন এই সম্রাট। চ্যানেল আগামীর পক্ষ থেকে সম্রাটকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধার সাথে।

spot_img

আরও পড়ুন

হারিয়ে যাওয়া মাজহাবগুলোর ইতিহাস: কেন টিকে থাকেনি ইসলামের বহু ফিকহি ধারা

ইসলামের ইতিহাসে বর্তমানে হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—এই চার...

সময়ের বরকত অর্জনে মুমিনের ৫ কার্যকর অভ্যাস

ইসলামে সময়কে মানুষের জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা...

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইসলামের ৫ গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় বর্তমানে বিশ্বের...

কোরআনের আলোকে আদর্শ পিতার ৫ গুণ

পবিত্র কোরআনে নবী ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনকে একজন দায়িত্বশীল, প্রজ্ঞাবান...

হালাল উপার্জনের পথে চাকরিজীবীদের জন্য ৫ নির্দেশনা

জীবিকার সন্ধানে মানুষ চাকরি, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা বিভিন্ন পেশায়...

ইসলামে বিনোদন: বৈধতার সীমা ও নৈতিকতার নীতিমালা

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক চাহিদার অংশ হিসেবে বিনোদনকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ...

অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে ইসলামের পাঁচটি মৌলিক নীতি

ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও...

নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে মুমিনের জীবনে যে ছয়টি উপকার আসে

প্রতিদিনের জীবনে মানুষ অসংখ্য নেয়ামত ভোগ করলেও সেগুলোর অনেকটাই...

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পাবে না যেসব শিশু

দেশব্যাপী পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের আওতায় ৬ থেকে...

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে জাপানের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদারের লক্ষ্যে...

ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে ভিওন চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলালিংকের মূল...

মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে শোক প্রকাশ তথ্যমন্ত্রীর

একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের...

সন্ধ্যা পর্যন্ত ১২ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত

দেশের ১২টি জেলার ওপর দিয়ে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘণ্টায়...
spot_img

আরও পড়ুন

হারিয়ে যাওয়া মাজহাবগুলোর ইতিহাস: কেন টিকে থাকেনি ইসলামের বহু ফিকহি ধারা

ইসলামের ইতিহাসে বর্তমানে হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—এই চার মাজহাবই সবচেয়ে পরিচিত। তবে ইসলামি ফিকহের প্রাথমিক যুগে আরও অনেক সুসংগঠিত মাজহাবের অস্তিত্ব ছিল। সময়ের...

‘পিতা’ শব্দের কোরআনিক ব্যবহার: পিতৃত্বের ধারণা, ভাষাগত তাৎপর্য ও পারিবারিক শিক্ষার বিশ্লেষণ

পবিত্র কোরআনে পিতা কেবল একটি পারিবারিক পরিচয়ের নাম নয়; বরং দায়িত্ব, স্নেহ, ত্যাগ ও আদর্শিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপিত হয়েছেন। সন্তানের লালন-পালন, নৈতিক শিক্ষা...

সময়ের বরকত অর্জনে মুমিনের ৫ কার্যকর অভ্যাস

ইসলামে সময়কে মানুষের জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসে সময়ের যথাযথ ব্যবহার, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং ইবাদতের মাধ্যমে জীবনকে সুশৃঙ্খল...

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইসলামের ৫ গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ইসলাম প্রকৃতি ও পরিবেশকে আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে এবং পৃথিবীর ভারসাম্য...
spot_img