চার বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন ৭৪ বছর বয়সী এক খামারি। এনজিওর আশ্বাসে ঋণের সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করলেও মামলা থেকে এখনো মুক্তি মেলেনি তার। বরং নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে আদালতে, আর এ অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে দিন কাটছে এই প্রবীণ খামারির।
ঘটনাটি জয়পুরহাটের কালাই পৌরশহরের পাঁচশিরা বাজার এলাকার। ভুক্তভোগী শামসুর রহমান ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ব্র্যাক মাইক্রো ফাইন্যান্স (প্রগতি) কালাই শাখা থেকে পোলট্রি খামারের জন্য তিন লাখ টাকা ঋণ নেন। ওই অর্থ দিয়ে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা কিনে খামার শুরু করেন তিনি।
কিন্তু ঋণ নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই দেশে করোনা মহামারি শুরু হয়। একই সময়ে ব্রয়লার মুরগি খেলে ক্যান্সার হতে পারে—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে বাজারে চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যায়। বিক্রি করতে না পেরে দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের অনেক জীবিত মুরগি মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হন তিনি। এতে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যান শামসুর রহমান।
এরপরও শুরুতে তিনি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন। তবে পরবর্তীতে আর্থিক সংকটে পড়লেও সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু অর্থ পরিশোধ চালিয়ে যান। এক পর্যায়ে কিস্তি বন্ধ হয়ে গেলে ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ব্র্যাক। ওই সময় এনজিওর দাবি ছিল এক লাখ ২২ হাজার টাকা।
শামসুর রহমানের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পরও এনজিওর তখনকার মাঠ কর্মকর্তা অজিত রায় তার কাছ থেকে কিস্তির টাকা আদায় করেন। ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পাঁচ হাজার টাকা এবং পরের মাসেও আরো পাঁচ হাজার টাকা কিস্তি দেওয়া হয়। পরে আদালতের নোটিশ পাওয়ার পর তিনি এনজিওর ব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ঋণের মূল টাকা পরিশোধ করলে মামলা প্রত্যাহার ও সুদের টাকাও মওকুফ করার আশ্বাস দেন।
এই আশ্বাসে সম্পত্তি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করেন শামসুর রহমান। মামলায় এনজিও দুই লাখ ৮৯৪ টাকার দাবি করলেও ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর তার কাছ থেকে নগদ ৬৫ হাজার টাকা এবং তার সঞ্চয় হিসাবের অর্থসহ মোট ৭১ হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হয়। শামসুরের দাবি, আদালতের মাধ্যমে টাকা না নিয়ে এনজিও কর্তৃপক্ষ সরাসরি পাস বইয়ের মাধ্যমে ওই টাকা জমা নেয়। কিন্তু এর পরও মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি।
বর্তমানে নিয়মিত জয়পুরহাট আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন শামসুর। তিনি বলেন, ‘ঋণের টাকা শোধ করার পরও কেন আমাকে আদালতে ঘুরতে হচ্ছে, আমি জানি না। বাদীপক্ষ অনেক সময় আদালতে উপস্থিত না থাকলেও আমাকে হাজিরা দিতে হয়। খামার শেষ হয়ে গেছে, বয়স হয়েছে। এখন শুধু আদালত আর অফিসে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’
শামসুর আরো বলেন, ‘যারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তারা এখন আর ওই অফিসে নেই। নতুন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর কেউ কোনো কথা বলতে চায় না। অনেক সময় কিছুই জানি না বলে আমাকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমার সমস্যাটা দেখার কেউ নেই।’
এ ব্যাপারে ব্র্যাক মাইক্রো ফাইন্যান্স (প্রগতি) কালাই শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে আগে কী আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি এখানে নতুন যোগ দিয়েছি। বিষয়টি এখন আদালতের অধীনে। আদালতই এর সমাধান করবেন।’
আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাড. লক্ষণ শীল বলেন, ঋণ পরিশোধের কাগজপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঋণের বিপরীতে করা চেক ডিজঅনার মামলাটি এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। ঋণের টাকা পরিশোধের পরও মামলা চালিয়ে যাওয়া আসামিকে হয়রানি করার শামিল।
কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম আরা বলেন, ‘খামারি যদি ঋণের টাকা পরিশোধ করে থাকেন, তাহলে মামলা প্রত্যাহার হবে না কেন—সেটি অবশ্যই প্রশ্নের বিষয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিএ/এমই


