নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। আগাম বন্যা, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জনজীবনে তৈরি হয়েছে গভীর সংকট। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক ও মৎস্যজীবীরা, যাদের জীবিকা এখন ক্রমেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের বরান্তর গ্রামের প্রবীণ কৃষক ইদ্রিছ মিয়া এ বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। চলতি মৌসুমে তার আট কাঠা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কিছু আধাপচা ধান উদ্ধার করতে পারলেও তা দিয়ে পুরো বছরের খাদ্যচাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না বলে শঙ্কা তার। হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, “কত কষ্ট কইরা ক্ষেতটা করছিলাম। আট কাডা (কাঠা) ক্ষেত সবডা পানিতে ডুইব্বা গেছে। ক্ষেতটার মাঝে নাকের হমান (সমান) পানি অইছিন। কয়ডা ধান কাইট্টা আনতাম পারছিলাম। যা আনতাম পারছিলাম, তা দিয়া সারা বছর কিবায় (কিভাবে) চলবাম, কিতা খাইয়াম?”
শুধু ইদ্রিছ মিয়াই নন, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের হাজারো কৃষক একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি। মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, মদন ও কলমাকান্দার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন চৈত্র মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আগাম বন্যার আশঙ্কা দেখা দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দশক আগেও বৈশাখের শেষ দিকে বন্যার ঝুঁকি দেখা দিলেও বর্তমানে মৌসুমের শুরু থেকেই উজানের ঢল ও অতিবৃষ্টির শঙ্কা তৈরি হয়।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তিত আচরণের কারণে আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষিকাজ, ফসল উৎপাদন ও জীবিকা পরিকল্পনায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
সম্প্রতি মোহনগঞ্জ উপজেলার বরান্তর সড়ক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েক কিলোমিটারজুড়ে কৃষকেরা পানিতে ভেজা ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত। কেউ নৌকায় করে ধান নিয়ে আসছেন, আবার কেউ সড়কের পাশে ছড়িয়ে রোদে শুকানোর চেষ্টা করছেন।
একই এলাকার গৃহবধূ রোকেয়া জানান, সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে তারা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু আগাম বন্যায় প্রায় পুরো ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “সমিতি থাইক্যা কিস্তিতে ট্যাহা লইয়্যা ক্ষেতটি করছিলাম। সবডি (পুরোটা) ক্ষেত পানিতে ডুইব্বা গেছে। কিছু ধান লইতাম হারছি। যেডি লইছিলাম, হেইনও অনেক ধান পইচ্ছা গেছে। অহন কিছু ধান কোনোমতে শুকাইতাছি, যাতে অন্তত ভাত খাওনের খোরাকিডা মিলে।”
হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা মূলত একটি ফসলের ওপর নির্ভরশীল। বছরের অধিকাংশ সময় তারা বোরো ধান ঘরে তোলার অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু ধান কাটার আগেই যদি পাহাড়ি ঢল বা আগাম বন্যা আসে, তাহলে কয়েক মাসের শ্রম মুহূর্তেই পানিতে ডুবে যায়।
২০২২ সালের ভয়াবহ আগাম বন্যার ক্ষত এখনো অনেক কৃষকের মনে তাজা। সে সময় হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছিল। ঋণ নিয়ে চাষ করা বহু কৃষক আর্থিক সংকটে পড়েন। চলতি বছরেও অনেক এলাকায় প্রায় একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যার কারণে জেলায় মোট ১৭ হাজার ৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলের ক্ষতির পরিমাণ ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর। প্রায় ১০ হাজার ৭২৭ হেক্টর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানান, এ দুর্যোগে জেলায় ৭৭ হাজার ৩৩৬ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু হাওরাঞ্চলেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৩৮ হাজার ২৩৮ জন। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী জেলায় ফসলের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা। হাওরাঞ্চলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষির পাশাপাশি মৎস্যসম্পদেও পড়ছে। খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের জেলে রিটন মিয়ার ভাষ্য, একসময় হাওরে প্রচুর পাবদা, টেংরা, গুতুম, খলিসা ও বাইন মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে এসব মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পানির গভীরতা, প্রবাহ ও প্রজনন পরিবেশের পরিবর্তনের পাশাপাশি জলাশয় সংকুচিত হওয়াকে তিনি এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় নদীভাঙনের ঝুঁকিও বেড়েছে। সোমেশ্বরী, উপদাখালী, কংস ও ধনু নদীর বিভিন্ন অংশে ভাঙন ও নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি ও বসতভিটা, যা স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সমাজকর্মী অধ্যাপক আল হেলাল তালুকদার বলেন, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে। ফসলহানি ও মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার জীবিকার সন্ধানে অন্য জেলায় শ্রম বিক্রি করতে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ স্থায়ীভাবে শহরমুখী হচ্ছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা মনে করেন, হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, “হাওরের পরিবেশ ও প্রকৃতি বিনষ্টের অন্যতম কারণ অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ। এটি বন্ধে স্থানীয় মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের একটি হলো হাওরাঞ্চল। তাই এ অঞ্চলের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত করে এমন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া উচিত নয়।”
তিনি আরও বলেন, “পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে- এমন চলমান প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে তা অপসারণ করতে হবে। এছাড়া ভরাট হয়ে যাওয়া নদী, খাল ও বিল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
সিএ/এমই


