গত পাঁচ দশকে রাজশাহী অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। একই সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে দেশের অন্যতম খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ক্লিনার ওয়াটার-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কমে যাওয়া বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতির কারণে অন্তত ২০৩২ সাল পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র পানিসংকট অব্যাহত থাকতে পারে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের গবেষকরা।
গবেষণায় স্যাটেলাইট চিত্র, আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য, ভূগর্ভস্থ পানির উপাত্ত এবং রাজশাহীর ১৩টি উপজেলার ৩৮৫টি পরিবারের ওপর পরিচালিত মাঠ জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে গড় বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত ছিল এক হাজার ৪০৬ মিলিমিটার। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ কয়েক দশকে বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত কমছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার প্রবণতা। গবেষকদের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি শতাব্দীর শেষভাগে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কয়েকবার ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। এমনকি ২০৮৮ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ৪৭.১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়। গত ৩৫ বছরে রাজশাহীতে পানির স্তর গড়ে ৩.৭৮ মিটার নিচে নেমে গেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির গড় গভীরতা ছিল ১১.৬৬ মিটার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫.৪৪ মিটারে।
মাঠ জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ পানিসংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। ৯৫ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন, দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি সংগ্রহ ও নিশ্চিত করতে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এছাড়া শতভাগ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নামতে দেখছেন।
সংকট বাড়লেও সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে গবেষণায়। প্রায় ৭৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, পানি ব্যবস্থাপনা বা সংকট মোকাবেলায় তারা কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পাননি।
গবেষকদের মতে, দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়া হলে রাজশাহীর পানির নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ, সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিয়ন্ত্রণ এবং খরা-সহনশীল ফসলের চাষ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।
তাদের মতে, পানিনির্ভর ধান চাষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে রাজশাহীর ক্রমবর্ধমান পানিসংকট মোকাবেলায় ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে।
সিএ/এমই


