রাজধানী ঢাকা দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অন্যতম কেন্দ্র। জীবনের অধিকাংশ সময় এই শহরে কাটালেও মৃত্যুর পর অনেক মানুষের জন্য এখানেই শেষ আশ্রয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে। কবরস্থানে জায়গার সংকট, সংরক্ষণ ব্যয়ের উচ্চ হার এবং সীমিত অবকাঠামোর কারণে বহু পরিবারকে প্রিয়জনের মরদেহ দাফনের জন্য রাজধানীর বাইরে যেতে হচ্ছে।
প্রতিদিন ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য হাজারো মানুষ ভিড় করেন। অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরার প্রত্যাশা নিয়ে আসলেও কেউ কেউ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এরপর শুরু হয় স্বজনদের জন্য আরেকটি কঠিন বাস্তবতা—দাফনের ব্যবস্থা করা। শোকের মুহূর্তে কবরস্থান খোঁজা, নিবন্ধন সম্পন্ন করা এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধের মতো নানা প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয় পরিবারকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর জনসংখ্যা ও নগর বিস্তৃতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি কবরস্থানের সংখ্যা বা ধারণক্ষমতা। ফলে দীর্ঘদিন ঢাকায় বসবাস করা অনেক মানুষ মৃত্যুর পরও স্থায়ীভাবে রাজধানীতে দাফনের সুযোগ পান না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
নগরবাসীর একটি বড় অংশের নিজস্ব জমি না থাকায় রাজধানীতে স্থায়ী কবরের নিশ্চয়তা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে কবর সংরক্ষণের ব্যয়ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে মৃত্যুর পর সম্মানজনক ও স্থায়ী দাফন নিশ্চিত করা অনেক পরিবারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বনানী কবরস্থানে দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের সংরক্ষণ খরচ অত্যন্ত বেশি। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন কবরস্থানগুলোতেও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কবর সংরক্ষণে কয়েক লাখ থেকে শুরু করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কবর সংরক্ষণ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, খিলগাঁও কবরস্থান সম্প্রসারণের জন্য সরকারি জমি চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া গেলে কবরস্থানের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
তবে স্থান সংকটের মধ্যেও রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থান বহু মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। আজিমপুর কবরস্থানে মায়ের কবর জিয়ারত করতে আসা কবির হোসেন বলেন, কবরের পাশে দাঁড়ালে এখনও মনে হয় তিনি মায়ের সঙ্গেই কথা বলছেন। তার কাছে মায়ের উপস্থিতি আজও অনুভব করেন তিনি।
কবরস্থান সংশ্লিষ্টরা জানান, জায়গার স্বল্পতার কারণে নতুন করে স্থায়ী কবর সংরক্ষণের অনুমতি সাধারণত দেওয়া হচ্ছে না। কারণ ব্যাপক হারে কবর সংরক্ষণ করলে নতুন দাফনের জন্য স্থান সংকট আরও বাড়বে। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পর পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। তবে পূর্বে দাফন করা ব্যক্তিদের কবর শনাক্তের জন্য সারিভিত্তিক নম্বর সংরক্ষণ করা থাকে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনায় জনসংখ্যার অনুপাতে কবরস্থানের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সেই প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। ফলে নগরায়ণের চাপের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর পর মানুষের শেষ আশ্রয়ের স্থানও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মূল্যবান জমি যদি টাকা দিয়ে কিনতে হয় সরকার টাকা দিয়ে কিনবে। কিন্তু মানুষকে তার অধিকার দিতে হবে। সেজন্য মৃত্যুর পরেও তার প্রিয়জনের কাছে অন্তত কাছাকাছি কবরস্থানেই দিয়ে যেতে পারে, সেখানে তার জন্য একটু দোয়া করতে পারে। এবং এটা মানুষকে কিন্তু বেঁচে থাকার শক্তি দেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত নগরায়ণের বাস্তবতায় রাজধানীর কবরস্থান ব্যবস্থাপনা ও সম্প্রসারণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। ফলে ঢাকায় মৃত্যু শুধু প্রিয়জন হারানোর বেদনা নয়, শেষ আশ্রয় নিশ্চিত করার সংগ্রামেও পরিণত হচ্ছে।
সিএ/এমআর


