নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি মামলার বিচার। আদালতে চার্জশিট দাখিলের তারিখ পিছিয়েছে ১০৩ বার। ফলে দেশজুড়ে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কবে শুরু হবে বা শেষ হবে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ত্বকীর পরিবারসহ সংশ্লিষ্টরা এখন নতুন সরকারের দিকেই তাকিয়ে আছেন।
এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের এ লেভেলের প্রথম পর্বের শিক্ষার্থী ছিল ত্বকী। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তার পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের ফল প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, পদার্থবিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে ২৯৭ পেয়ে সে বিশ্বে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করে। রসায়নেও তার প্রাপ্ত নম্বর ছিল ২৯৪, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি আশির দশক থেকেই নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছেলের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বিচারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেন তিনি। পরে সম্পূরক অভিযোগপত্রে শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ ওসমান পরিবারের ক্যাডারদের দায়ী করা হয়।
মামলার তদন্ত শুরুতে পুলিশ করলেও একপর্যায়ে তা স্থবির হয়ে পড়ে। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব-১১। তদন্তের সময় আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর আল্লামা ইকবাল রোডে আজমেরী ওসমানের কথিত টর্চার সেলে অভিযান চালিয়ে র্যাব হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার করে। তবে বর্তমানে সেই টর্চার সেলের কোনো চিহ্ন নেই, সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে।
২০১৪ সালের ৮ মার্চ র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সংবাদ সম্মেলনে জানান, ত্বকী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। তিনি আজমেরী ওসমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তৈরি চার্জশিটের খসড়াও প্রকাশ করেন এবং দ্রুত তা আদালতে জমা দেওয়ার কথা জানান। কিন্তু সেই ঘোষণার পরও গত ১৩ বছরে চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়নি। এ সময়ের মধ্যে আদালতে ১০৩ বার তারিখ পরিবর্তন হয়েছে, যার মধ্যে ৯৪টি তারিখ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি জিয়াউল ইসলাম কাজল বলেন, ‘ত্বকী এখন নারায়ণগঞ্জের সব অন্যায়ের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে এখন একটি আদর্শের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে আদর্শকে হত্যা করা যায় না।’ তিনি আরও বলেন, ত্বকী হত্যার বিচারের দাবি শুধু তার পরিবারের নয়, এটি পুরো দেশবাসীর দাবি। তার মতে, এই হত্যার বিচার নিশ্চিত করে নতুন সরকারকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রমাণ দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) দুপুরে ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শেখ হাসিনার কারণে এই হত্যার বিচার হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েকজন উপদেষ্টা বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ তখন পাওয়া যায়নি। কিন্তু দেড় বছরেও সেসব প্রমাণ সংগ্রহ না হওয়াকে তিনি তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি হিসেবে দেখছেন।
রফিউর রাব্বি বলেন, ‘আমরা এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছি। ২০১৩ সালে খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জে এসে ত্বকী হত্যার বিচার চেয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সমাবেশেও তিনি ত্বকী হত্যার বিচার চেয়েছেন। এবারের নির্বাচনের আগে তারেক রহমানও নারায়ণগঞ্জে এসে ত্বকী হত্যার বিচারের কথা বলেছেন। আমরা আশা করি, তাদের সময়ে আমরা বিচারটা পাব।’
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র্যাব-১১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দীপক চন্দ্র মজুমদারকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। র্যাব-১১-এর সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলেই দেওয়া হবে অভিযোগপত্র।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী প্রদীপ ঘোষ বাবু জানান, এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আজমেরী ওসমানের ড্রাইভার জমশেদ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সুলতান শওকত ভ্রমর ও সালেহ রহমান সীমান্ত সীমান্ত পলাতক। অন্য আসামিদের মধ্যে রিফাত বিন ওসমান, মামুন মিয়া, তাহের উদ্দিন জ্যাকি, ইউসুফ হোসেন লিটন, কাজল হাওলাদার, সাফায়াত হোসেন শিপন, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ইয়ার মোহাম্মদ পারভেজ জামিনে মুক্ত আছেন। এদের মধ্যে সুলতান শওকত ভ্রমর, সালেহ রহমান সীমান্ত ও কাজল হাওলাদার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদা চৌধুরীর আদালতে মামলাটির ১০৩তম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেদিনও চার্জশিট জমা হয়নি। আদালত আগামী ২৬ এপ্রিল নতুন তারিখ নির্ধারণ করে তদন্ত কর্মকর্তাকে চার্জশিট দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
ত্বকী স্মরণে কর্মসূচি
ত্বকীর স্মরণে শুক্রবার (৭ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টায় বন্দরের সিরাজ শাহর আস্তানায় তার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। ৮ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলোক প্রজ্বালনের কর্মসূচি রয়েছে। এছাড়া ১৪ মার্চ দুপুর আড়াইটায় ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ‘ত্বকী সমাবেশ’ আয়োজন করা হবে।
সিএ/এএ


