প্রতিদিনের জীবনে মানুষ অসংখ্য নেয়ামত ভোগ করলেও সেগুলোর অনেকটাই অগোচরে থেকে যায়। সুস্থভাবে ঘুম থেকে জেগে ওঠা, বিশুদ্ধ পানি পান করা, পরিবারের সান্নিধ্য কিংবা নিরাপদ জীবন—সবই মহান আল্লাহর অনুগ্রহ। ইসলামে এসব নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কৃতজ্ঞতা শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়, বরং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
প্রথমত, কৃতজ্ঞতা নেয়ামত বৃদ্ধির কারণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)
তাফসিরবিদদের মতে, এই বৃদ্ধি শুধু সম্পদে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রিজিক, বরকত, মানসিক প্রশান্তি, ইমান এবং জীবনের বিভিন্ন কল্যাণও এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে কৃতজ্ঞতা মানুষের জীবনে আল্লাহর অনুগ্রহ আরও বিস্তৃত হওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
দ্বিতীয়ত, কৃতজ্ঞতার অভ্যাস মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। ইসলাম শুধু আল্লাহর প্রতি নয়, মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শিক্ষা দেয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৪)
অন্যের উপকারের স্বীকৃতি দেওয়ার মানসিকতা পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে এবং সামাজিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
তৃতীয়ত, কৃতজ্ঞতা কঠিন সময়েও মানুষকে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে সহায়তা করে। জীবনে সুখ ও দুঃখ উভয়ই পরীক্ষা। কৃতজ্ঞ মানুষ বিপদের মধ্যেও আল্লাহর দেওয়া অন্যান্য নেয়ামতের কথা স্মরণ করতে পারেন, যা ধৈর্য ধারণে সহায়ক হয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের অবস্থা বড়ই বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ পেলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়; আর কষ্টে আক্রান্ত হলে সে ধৈর্য ধারণ করে। ফলে তা–ও তার জন্য কল্যাণকর হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
চতুর্থত, কৃতজ্ঞতা মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। অন্যের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতা অনেক সময় অস্থিরতা ও অসন্তোষের জন্ম দেয়। কিন্তু কৃতজ্ঞ মানুষ নিজের প্রাপ্তির মূল্য উপলব্ধি করেন এবং যা রয়েছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করেন।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের চেয়ে নিচের অবস্থার মানুষের দিকে তাকাও, ওপরের অবস্থার মানুষের দিকে তাকিয়ো না। তাহলে আল্লাহর নেয়ামতকে তুচ্ছ মনে করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৬৩)
পঞ্চমত, কৃতজ্ঞতা মানুষকে অহংকার থেকে দূরে রাখে। নিজের অর্জনকে আল্লাহর দান হিসেবে উপলব্ধি করলে আত্মগর্ব ও অন্যকে ছোট করে দেখার প্রবণতা কমে যায়।
নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)
ষষ্ঠত, কৃতজ্ঞতা মানুষকে আখিরাতের জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত করে। আল্লাহর দেওয়া জীবন, জ্ঞান, সম্পদ ও শারীরিক সক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন বান্দার পা এক চুলও নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন, জ্ঞান, সম্পদ আর শরীরের ব্যবহার নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৬)
ইসলামী শিক্ষায় কৃতজ্ঞতাকে দৈনন্দিন জীবনের একটি অভ্যাসে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন নিজের প্রাপ্তির কথা স্মরণ করা, অন্যের উপকারের জন্য ধন্যবাদ জানানো এবং অসহায় মানুষের কথা মনে রাখা—এ ধরনের ছোট ছোট অভ্যাস একজন মুমিনের অন্তরে কৃতজ্ঞতার ভিত্তি গড়ে তোলে। আর এই গুণই তাকে প্রশান্ত, সন্তুষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনে সহায়তা করে।
সিএ/এমআর


