চীনের মহাপ্রাচীরকে ঘিরে নতুন এক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বহু শতাব্দী আগের সামরিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের নানা অজানা তথ্য। বেইজিংয়ের কাছে অবস্থিত জিয়ানকৌ অংশে পরিচালিত খননকাজে মিলেছে মিং রাজবংশ আমলের একটি প্রাচীন কামান, সৈন্যদের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্থাপনা, নির্মাণসংক্রান্ত তথ্য এবং শ্রমিকদের ব্যক্তিগত অনুভূতির নিদর্শন।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ২০২৫ সালের শেষদিকে পরিচালিত এই খনন কার্যক্রম মহাপ্রাচীরের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনটি ওয়াচ টাওয়ার এবং সেগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন অংশে অনুসন্ধান চালিয়ে গবেষকেরা প্রাচীন চীনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দৈনন্দিন জীবনের নানা চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে মিং রাজবংশ আমলের একটি কামানকে। প্রায় ৩৫ ইঞ্চি দীর্ঘ এবং ২৪৭ পাউন্ড ওজনের এই কামানে খোদাই করা শিলালিপি থেকে জানা যায়, এটি ১৬৩২ সালের দিকে নির্মিত হয়েছিল। গবেষকদের মতে, কামানটির নকশায় ইউরোপীয় সামরিক প্রযুক্তির প্রভাব রয়েছে, যা সে সময় চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময়ের ইঙ্গিত দেয়।
খননকাজে আরও পাওয়া গেছে সৈন্যদের ব্যবহৃত গুদামঘর, ইটের তৈরি উনুন এবং উত্তপ্ত বিছানার মতো কাঠামো। এসব নিদর্শন থেকে জানা যায়, সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত সৈন্যদের জীবনযাত্রা কেমন ছিল।
১১৭ নম্বর ওয়াচ টাওয়ারে পাওয়া একটি স্মৃতিফলক থেকে ১৫৭৩ সালের নির্মাণসংক্রান্ত তথ্য মিলেছে। এছাড়া বিভিন্ন ইটের গায়ে খোদাই করা ওজনসংক্রান্ত তথ্য মিং আমলের নির্মাণপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে।
সবচেয়ে মানবিক ও আবেগঘন আবিষ্কার ছিল একটি ইটের ওপর খোদাই করা বাক্য। এর অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “মদ আর দুশ্চিন্তা ছাড়া জীবনে আর কিছুই নেই; তিন বছরের কঠোর পরিশ্রমে আমার চুল সাদা হয়ে গেছে”। গবেষকদের ধারণা, মহাপ্রাচীর নির্মাণে অংশ নেওয়া কোনো শ্রমিক নিজের কষ্টের অভিজ্ঞতা এভাবেই প্রকাশ করেছিলেন।
প্রাচীরের নির্মাণসামগ্রী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চুন-সুরকির মিশ্রণে উচ্চমাত্রার ম্যাগনেসিয়াম এবং উদ্ভিজ্জ আঁশ ব্যবহার করা হয়েছিল, যা নির্মাণকে আরও টেকসই করেছে।
গবেষণায় শস্য, ঔষধি উদ্ভিদ, গৃহপালিত ও বন্য প্রাণীর হাড় এবং ২৮টি নীলকান্তমণি পাথরের শিল্পকর্মও উদ্ধার করা হয়েছে। এসব নিদর্শন থেকে তৎকালীন খাদ্যাভ্যাস, চিকিৎসাব্যবস্থা এবং উত্তর চীনের বাণিজ্য নেটওয়ার্ক সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, মহাপ্রাচীর কেবল একটি সামরিক স্থাপনা নয়; এটি প্রাচীন মানুষের জীবন, শ্রম, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। ভবিষ্যতে আরও খননকাজের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা থেকে নতুন তথ্য উঠে আসতে পারে।
সিএ/এমআর


