বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও পরিবেশবান্ধব বাহন সাইকেলের ইতিহাস শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গল্প নয়, বরং এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ এবং মানবজাতির বিকল্প খোঁজার প্রচেষ্টার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ইতিহাসবিদদের মতে, উনিশ শতকের শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত পরোক্ষভাবে সাইকেল আবিষ্কারের পথ তৈরি করে দেয়।
১৮১৫ সালে বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার সুমবাওয়া দ্বীপে অবস্থিত তামবোরা আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বিপুল পরিমাণ ছাই ও ধূলিকণা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ায় পরবর্তী বছরটি ইতিহাসে ‘ইয়ার উইদাউট আ সামার’ বা ‘গ্রীষ্মহীন বছর’ নামে পরিচিত হয়। ইউরোপজুড়ে খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
সেই সময় ইউরোপে যাতায়াত ও পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল ঘোড়া। কিন্তু খাদ্যের অভাবে ঘোড়া পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প বাহনের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৮১৭ সালে জার্মান উদ্ভাবক ব্যারন কার্ল ভন ড্রেইস ইতিহাসের প্রথম দুই চাকার বাহন তৈরি করেন। তিনি এর নাম দেন ‘লাউফমেশিন’, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ছুটন্ত যন্ত্র’। পরবর্তীতে এটি ‘ড্রেইসিন’ নামেও পরিচিতি পায়।
এক বছর পর তিনি আরও উন্নত সংস্করণ ‘ভেলোসিপেড’ তৈরি করেন। এতে ছিল স্টিয়ারিং ব্যবস্থা এবং চালকের পা দিয়ে গতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ। ১৮১৮ সালে তিনি এই উদ্ভাবনের পেটেন্টও গ্রহণ করেন। সে সময় অনেকেই এটিকে ‘হবি-হর্স’ বা ‘শখের ঘোড়া’ নামে ডাকতেন।
ড্রেইসের জীবনীকারদের মতে, ঘোড়ার বিকল্প তৈরি করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। এমন একটি বাহন, যা চালাতে খাবার বা প্রাণী পালনের প্রয়োজন হবে না। খাদ্য সংকটের সময় সাধারণ মানুষ এই নতুন উদ্ভাবনের প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করে।
প্রায় ২২ কেজি ওজনের কাঠের তৈরি ওই সাইকেলে চড়ে ড্রেইস ১৮১৭ সালের ১২ জুন এক ঘণ্টারও কম সময়ে ১৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন। তবে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেক শহরে এ ধরনের বাহন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে এর জনপ্রিয়তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
তবে সাইকেলের ধারণা থেমে থাকেনি। ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন উদ্ভাবক দুই, তিন ও চার চাকার নতুন নতুন বাহন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে থাকেন।
১৮৬৩ সালে ফরাসি উদ্ভাবক পিয়েরে লালমেন্ট, পিয়েরে মিশোঁ এবং আর্নেস্ট মিশোঁ ধাতব ফ্রেম ও পেডালযুক্ত নতুন ধরনের বাহন তৈরি করেন, যা ‘বাইসাইকেল’ নামে পরিচিতি পায়। ধাতব কাঠামো এবং ঝাঁকুনিপূর্ণ যাত্রার কারণে এটি ‘বোন-শেকার’ নামেও পরিচিত ছিল।
পরবর্তীতে পেনি ফার্দিং ও হাই-হুইলারের মতো নানা সংস্করণ এলেও ১৮৮৫ সালে জন কেম্প স্টার্লি আধুনিক সাইকেলের ভিত্তি স্থাপন করেন। তার উদ্ভাবিত ‘সেফটি বাইসাইকেল’-এ প্রথমবারের মতো চেইন ড্রাইভ সিস্টেম এবং সমান আকারের দুটি চাকা ব্যবহার করা হয়।
এই নকশাই পরবর্তীতে আধুনিক সাইকেলের আদর্শ হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও সাইকেল গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সেনারা দ্রুত চলাচলের জন্য সাইকেল ব্যবহার করত। এমনকি যুদ্ধবিমান থেকে সৈন্যদের জন্য বিশেষ সাইকেল নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বর্তমানে সাইকেলকে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থার অন্যতম প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় সাইকেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিএ/এমআর


