জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাপপ্রবাহ, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ, পানিবাহিত সংক্রমণ, অপুষ্টি এবং মাতৃ ও প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও অর্থায়ন এখনও যথেষ্ট নয় বলে তারা মন্তব্য করেন।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন’ শীর্ষক নীতিসংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), এইচইকেএস/ইপিইআর এবং সুশীলন।
সংলাপে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, দেশে জলবায়ু-স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি এখনো স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের মোট বাজেটে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ২০২১-২২ অর্থবছরের ২.৭৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১.৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে। জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশও ২.৫ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১.৫ শতাংশে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, প্রকল্পনির্ভর অর্থায়নের কারণে রোগ নজরদারি, জরুরি প্রস্তুতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো পর্যাপ্ত অর্থ পাচ্ছে না।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) ২০২৩-২০৫০ এবং স্বাস্থ্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। এইচএনএপি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপদ পানির সংকট এবং দারিদ্র্যের কারণে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়েছে। অংশগ্রহণকারীদের ৮২.৫ শতাংশ নারী নিরাপদ পানি সংকটজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
তাদের মধ্যে অনেকে অনিয়মিত মাসিক, তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, গর্ভপাতসহ নানা প্রজনন স্বাস্থ্য জটিলতার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার সমস্যাও দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে যায়, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। বাংলাদেশেও এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
অনুষ্ঠানে সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন এখনো একটি অস্পষ্ট ক্ষেত্র এবং শক্তিশালী তথ্যভিত্তিক গবেষণা ছাড়া আন্তর্জাতিক অর্থায়ন পাওয়া কঠিন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ইকবাল কবির বলেন, জলবায়ু-স্বাস্থ্য এখনো বৈশ্বিকভাবেই অবহেলিত একটি খাত।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, জলবায়ু বিষয়টি এখনও উন্নয়ন পরিকল্পনায় পুরোপুরি মূলধারায় আসেনি, ফলে কার্যক্রম বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তারা তথ্যভিত্তিক নীতি ও তৃতীয় পক্ষীয় যাচাই ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সংলাপ শেষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধি, বাজেট ট্র্যাকিং উন্নয়ন এবং অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়ন জোরদারের সুপারিশ করা হয়।
সিএ/এমই


