ইসলামের ইতিহাসে মদিনা শুধু হিজরতের গন্তব্য নয়, বরং একটি সুসংগঠিত ইসলামী সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। হিজরতের আগেই সেখানে ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াতের কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে মুসলিম সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে মদিনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের প্রতিনিধিরা ইসলামের শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করে মহানবী (সা.)-এর কাছে একজন শিক্ষক পাঠানোর অনুরোধ জানান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পবিত্র কোরআনের শিক্ষা লাভ করা এবং ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে জানা।
মদিনাবাসীর এ অনুরোধের প্রেক্ষিতে মহানবী (সা.) তরুণ সাহাবি মুসআব ইবনে ওমায়ের (রা.)-কে সেখানে প্রেরণ করেন। প্রখর মেধা, বাগ্মিতা ও দাওয়াতি দক্ষতার মাধ্যমে তিনি মদিনায় ইসলামের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর পরিচালিত এই শিক্ষাকেন্দ্রকেই ইসলামের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয় বা মাদ্রাসার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মুসআব (রা.)-এর প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যেই মদিনার বিভিন্ন গোত্র ও পরিবারে ইসলামের শিক্ষা পৌঁছে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী হজ মৌসুমে মদিনা থেকে ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী মক্কায় এসে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে ঐতিহাসিক আকাবার দ্বিতীয় শপথে অংশ নেন।
সে সময় নবীজির (সা.) চাচা আব্বাস উপস্থিত থেকে মদিনাবাসীকে দায়িত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে সতর্ক করেন। তিনি বলেন,
‘এ হচ্ছে আমার ভাতিজা মুহাম্মাদ। সর্বদা আপন গোত্রে সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করে আসছে। আপনারা যাঁরা তাঁকে মদিনায় নিয়ে যেতে চাইছেন, তাঁরা ভেবে দেখুন, যদি আপনারা তাঁর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন করতে পারেন এবং শত্রুদের হাত থেকে তাঁকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারেন, তবে এ দায়িত্ব গ্রহণে এগিয়ে আসুন। অন্যথায় তাঁকে তাঁর নিজের গোত্রেই থাকতে দিন।’
জবাবে মদিনার প্রতিনিধিরা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, ‘নিশ্চয় আমরা এই দায়িত্ব নিচ্ছি এবং তাঁর সঙ্গে কৃত বায়আতের পূর্ণ বাস্তবায়নই আমাদের একমাত্র কাম্য।’
পরে আসআদ ইবনে জুরারা (রা.) উপস্থিত সবাইকে অঙ্গীকারের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘হে মদিনাবাসী, একটু অপেক্ষা করো। তোমরা কি বুঝতে পারছ আজ তোমরা কোন বিষয়ে বায়আত করতে যাচ্ছ? বুঝে নাও, এই বায়আত গোটা আরব ও অনারবের বিরোধিতা এবং মোকাবিলার অঙ্গীকার। যদি তোমরা এটাকে পূরণ করতে পারো, তবেই বায়আত সম্পাদন করো। অন্যথায় নিজেদের অপারগতা প্রকাশ করে দাও।’
এর জবাবে সবাই একবাক্যে বলেন, ‘আমরা কোনো অবস্থাতেই এ বায়আত থেকে পিছু হটব না।’
পরে তারা মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমরা যদি এই অঙ্গীকার পূরণ করি, তাহলে আমরা কী প্রতিদান পাব?’ তিনি বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত।’ এ কথা শুনে সবাই বলে ওঠেন, ‘আমরা এতেই সন্তুষ্ট আছি। আপনি আপনার পবিত্র হাত বাড়িয়ে দিন, আমরা বায়আত করব।’
এই বায়আতের মাধ্যমে মদিনায় ইসলামের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়। পরবর্তীতে মহানবী (সা.) উপস্থিতদের মধ্য থেকে ১২ জন প্রতিনিধিকে দায়িত্ব প্রদান করেন, যারা ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াতের প্রসারে নেতৃত্ব দেন।
সিএ/এমআর


