দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর নিকারাগুয়ার প্রখ্যাত আদিবাসী নেতা ও সাবেক আইনপ্রণেতা ব্রুকলিন রিভেরার মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার। রবিবার (৩১ মে) নিকারাগুয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সরকারি হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৩ বছর বয়সী এই রাজনৈতিক নেতা মারা গেছেন।
রিভেরার মৃত্যু ঘিরে দেশটির অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের চাপের মুখে নিকারাগুয়া সরকার স্বীকার করেছিল যে, ২০২৩ সাল থেকে তিনি রাষ্ট্রীয় হেফাজতে ছিলেন। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোভিড-১৯–পরবর্তী জটিলতা, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, লিভারের অসুস্থতা এবং ফুসফুসের সংক্রমণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে প্রকাশিত একটি ছবিতে তাকে লাইফ সাপোর্টে অত্যন্ত দুর্বল ও শীর্ণকায় অবস্থায় দেখা যায়।
তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে তাকে গোপনে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। ফলে তার মৃত্যুর পেছনে সরকারি অবহেলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ রিড ব্রডি বলেন, এটিকে সাধারণ অসুস্থতা বলা ভুল হবে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তাকে যেভাবে জোরপূর্বক গুম করে রাখা হয়েছিল এবং স্বাধীন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, এটি তারই ফল।
মার্কিন প্রশাসনও এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, নিকারাগুয়া সরকার ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করছে এবং এটি মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ব্রুকলিন রিভেরা নিকারাগুয়ার আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি দেশটির আদিবাসীভিত্তিক রাজনৈতিক দল ইয়াতামার শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি ও সাংবিধানিক অধিকারের পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব পালনরত আইনপ্রণেতা থাকা অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, সরকারের ভিন্নমত দমনের অভিযানের অংশ হিসেবেই তাকে আটক করা হয়েছিল। এরপর তার আটকের বিষয়টি সরকার দীর্ঘদিন গোপন রাখে এবং পরিবারের সদস্যদেরও তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে রিভেরা নিকারাগুয়ার প্রথম সান্ডিনিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে কন্ট্রা বিদ্রোহী ও মিসুরাসাতা মিলিশিয়ার নেতা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে তার দল ইয়াতামা বর্তমান রাষ্ট্রপতি ড্যানিয়েল ওর্তেগার সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠন করলেও সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ওর্তেগা সরকার ইয়াতামা দলকে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করে। একই সময় রিভেরাসহ সরকারবিরোধী অনেক নেতা ও কর্মীর বিরুদ্ধে কঠোর দমনপীড়নের অভিযোগ ওঠে।
নির্বাসিত স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘১০০% নোটিসিয়াস’ ও ‘কনফিডেনসিয়াল’-এ প্রথম রিভেরার মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। এরপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকলে নিকারাগুয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করে।
সিএ/এমই


