মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছিল মরুভূমির এক সাধারণ গৃহে। দুধমাতা হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর পরিবারে কাটানো সেই সময় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নয়, ইসলামের ইতিহাসেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে এবং তায়েফের দক্ষিণে অবস্থিত বনু সাদ গোত্রের এলাকায় ছিল হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর বসতি। বর্তমান সৌদি আরবের মাইসান অঞ্চলের ‘আদ-দাহাসিন’ গ্রামটিই দীর্ঘদিন ধরে হালিমা সাদিয়ার বসতি হিসেবে পরিচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের পর আরবের প্রচলিত রীতিনুসারে শহরের শিশুদের বিশুদ্ধ ভাষা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় করে তোলার জন্য মরুভূমির দুধমাতাদের কাছে পাঠানো হতো। সেই ধারাবাহিকতায় বনু সাদের নারীদের সঙ্গে মক্কায় আসেন হালিমা সাদিয়া (রা.)।
সে সময় আরবে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ চলছিল। হালিমা (রা.) বর্ণনা করেন, তাঁদের পরিবারের অবস্থা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। খাবারের অভাবে শিশুরাও রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারত না। এমন পরিস্থিতিতেই তিনি এতিম শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজের কাছে নিয়ে যান।
ইতিহাসে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.)-কে ঘরে আনার পর থেকেই হালিমা (রা.)-এর পরিবারে আশ্চর্যজনক পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে। শুকিয়ে যাওয়া উষ্ট্রীর দুধ ফিরে আসে, ভেড়াগুলোও আগের তুলনায় বেশি সুস্থ ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। হালিমা (রা.) এ ঘটনাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মহানবী (সা.) প্রায় আড়াই বছর হালিমা সাদিয়ার গৃহে ছিলেন। মরুভূমির নির্মল পরিবেশে তাঁর শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিবাহিত হয়। ইসলামী ইতিহাসবিদদের মতে, বনু সাদে অবস্থানের কারণেই তিনি বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই বলেছেন, ‘আমি আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী; কোরাইশ আমাকে জন্ম দিয়েছে আর আমি বেড়ে উঠেছি বনু সাদে।’
পরবর্তী জীবনেও দুধমাতা হালিমা (রা.) ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর গভীর সম্পর্ক বজায় ছিল। হালিমা (রা.) মক্কায় এলে তিনি অত্যন্ত সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গে তাঁকে গ্রহণ করতেন। এমনকি দুধভাই ও দুধবোনদের প্রতিও তিনি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করতেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সেই ঐতিহাসিক গৃহটি সংরক্ষিত থাকলেও ২০১৮ সালে ওই এলাকার কিছু পুরোনো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। ফলে মহানবী (সা.)-এর শৈশবস্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিদর্শন বিলীন হয়ে যায়।
সিএ/এমআর


