রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তালুক শাহাবাজ গ্রামে এক সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চারজন নিহত হওয়ায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বৃহস্পতিবার ( ৫ ডিসেম্বর) দুপুরে গ্রামজুড়ে ছিল নীরবতা, স্বজনহারাদের কান্না আর শোকের ভারে ভারাক্রান্ত পরিবেশ।
বাড়ির উঠানে সারি করে রাখা চারটি খাটিয়া, পাশে নতুন খোঁড়া কবর—এই দৃশ্যই জানান দিচ্ছিল ভয়াবহতার চিত্র। ১২ বছর বয়সী তাইয়্যেবা ইসলামকে বাড়ির উঠানেই দাফন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিহত হয়েছেন তাঁর চাচা মমিনুল ইসলাম ওরফে রিন্টু (৪৫), চাচি মরিজন বেগম (৪০) এবং ফুফু শিউলি বেগম (৬০)। বাকি তিনজনকে পার্শ্ববর্তী কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল গফুর বলেন, ‘এতগুলো মানুষ এই গ্রামের মারা গেল। আমাদের এত কষ্ট। কাল থাকি আমাদের কোনো আনন্দ নাই। এই গ্রামে ঈদ নাই। সবার মন দুঃখে ভাঙ্গি গেছে।’
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানী থেকে ঈদ উদ্যাপন করতে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন তাঁরা। মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে শাহবাগ এলাকা থেকে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে ১৭ জন যাত্রা শুরু করেন। গাড়িতে নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ সবাই ছিলেন। ভোরের দিকে চালক ভুল পথে চলে যাওয়ার পর আবার ফিরে এসে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে থাকেন।
নিহতদের স্বজন সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এটা দুর্ঘটনা নয়, এটা মানুষোক ইচ্ছা করি মারি ফেলা। রোড চেনেন না, মানুষোক কইতেন। মানুষ বলি দিত। রোডে গাড়ি টানেন ১৩০। ওভারব্রিজ থেকে নামতেছে, তাও স্লো (ধীর) করেন নাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুনলোং, ড্রাইভার নাকি দুই রাত থাকি ঘুমায় না, খালি টিপ (ভাড়া) মারে।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, দ্রুতগতিতে চলার সময় চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে গাড়িটি সড়কের বিভাজকে আঘাত করে উল্টে যায়। পরে বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে একে একে চারজনের মৃত্যু হয়। মরদেহ নিয়ে আসার পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে গাজীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
দুর্ঘটনায় অন্তত আটজন আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। আহতদের মধ্যে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী রুম্মান রুমীর পা ও কোমর ভেঙে গেছে এবং তাঁদের মেয়ে তাসমিয়া আঘাত পেয়েছেন। তাঁদের রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
একই ঘটনায় বেঁচে গেছে ১ বছর ৪ মাস বয়সী শিশু ফাতেমা জান্নাত ইলহাম। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির যাত্রী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম থেকে উঠে শুনি, গাড়ি পাবনার রাস্তায় অনেক দূর চলে গেছে। আবার তারা ব্যাক করে। সকাল সাতটা–সাড়ে সাতটার দিকে আমরা সবাই ঘুমের মধ্যে ছিলাম, হঠাৎ করে বিকট শব্দ। গাড়ি উল্টে যাচ্ছে। কী হচ্ছে, কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। তারপর যখন গাড়িটা উল্টে স্থির হয়, তখন চোখ খুলে দেখি, গাড়িতে আগুন জ্বলছে। আমার স্ত্রী, সন্তান কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না। আগুনের তাপ খালি বাড়ছে।’
তিনি আরও জানান, স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তাঁর কন্যা ফাতেমার অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।
সিএ/এমই


