বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ঘন্টেশ্বর গ্রামে শুরু হয়েছে বারুণী স্নান ও ঐতিহ্যবাহী মেলা। ভোরের আলো ফুটতেই দূরদূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থী ও বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে শান্ত সবুজ এই গ্রাম। বিশ্বাস, আচার ও প্রাচীন সংস্কৃতির টানে মানুষের এই সমাগম যেন এক মিলনমেলায় রূপ নেয়।
মঙ্গলবার ( ১৭ মার্চ) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই পুণ্যস্নান প্রতিবছর মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীর ভোরে অনুষ্ঠিত হয়। নির্দিষ্ট তিথি অনুযায়ী রাত ৮টা ৩৭ মিনিট পর্যন্ত স্নান চলে। এই উপলক্ষে এখানে তিন দিনব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়, যা কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসছে।
ঘন্টেশ্বর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুণ্যার্থীরা বারুণী খালের জলে নেমে স্নান করছেন। কেউ প্রার্থনায় নিমগ্ন, কেউ ডুব দিচ্ছেন পুণ্যের আশায়। স্নান শেষে ভক্তরা ছুটে যাচ্ছেন সর্বজনীন শ্রীশ্রী গঙ্গা-বিষ্ণু-শিব-কালী-আদি অন্নপূর্ণা মন্দিরে। ফুল, ধূপ ও ফল নিয়ে পূজা-অর্চনায় অংশ নিচ্ছেন তারা। পুরো পরিবেশজুড়ে বিরাজ করছে আধ্যাত্মিক আবহ।
পুণ্যস্নানের পাশাপাশি ঘন্টেশ্বর মেলাও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কয়েক শতাব্দীর পুরোনো এই মেলায় ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিরও মেলবন্ধন দেখা যায়। মেলার ভেতরে কাঠের পিঁড়ি, রান্নার সামগ্রী, তালপাতার পাখা, শঙ্খ, শিশুদের খেলনাসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা।
ধামুরা ও শিকারপুরের কাঠশিল্পীরা যেমন তাদের তৈরি পণ্য নিয়ে অংশ নিয়েছেন, তেমনি বাটাজোরের শঙ্খশিল্পীরাও ধরে রেখেছেন তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য। শঙ্খ ব্যবসায়ী আন্না বণিক জানান, চার পুরুষ ধরে তাঁরা এই মেলায় আসছেন। তাঁদের কাছে এটি শুধু ব্যবসা নয়, পরিচয়েরও অংশ।
মেলায় কাঠের পিঁড়ি নিয়ে বসেছেন বিভূতি হালদার, আর ছোটদের খেলনা বিক্রি করছেন বানরীপাড়ার আবুল কালাম। খাদ্যপণ্যের সারিতেও ভিড় কম নয়—জিলাপি, মুড়িমুড়কি, পিঠাসহ নানা মিষ্টান্নে মুখর পুরো এলাকা। পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবে মেতে উঠেছেন দর্শনার্থীরা।
এই মেলাকে ঘিরে একটি প্রাচীন কিংবদন্তিও প্রচলিত আছে। পুরাণের ভগীরথ গঙ্গা দেবীকে পৃথিবীতে আনতে গেলে তাঁর একটি ঘণ্টা এই এলাকায় পড়ে যায় বলে বিশ্বাস করা হয়। সেখান থেকেই ‘ঘন্টেশ্বর’ নামের উৎপত্তি। সময়ের সঙ্গে মন্দিরের স্থাপনা পরিবর্তিত হলেও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা অটুট রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কবির মিয়া জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে তিনি এই মেলা দেখে আসছেন। কখন শুরু হয়েছে তা জানা না থাকলেও এটি তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
এ গ্রামে একটি শতবর্ষী ইটের সেতুও রয়েছে, যা এখন কিছুটা জরাজীর্ণ হলেও অতীতের ইতিহাস বহন করে চলছে। এই সেতু, মেলা ও পুণ্যস্নান মিলিয়ে ঘন্টেশ্বর আজও দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
সিএ/এমই


