বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জনপদ ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলা। এই জেলা শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রায় আড়াইশ বছরের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাইসাহেবা জামে মসজিদ। সময়ের নানা পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়েও মসজিদটি আজও স্থানীয় মুসলিম সমাজের ধর্মীয় চেতনা, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
ঐতিহাসিক সূত্র ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ২৫০ বছর আগে আঠারো শতকের শেষভাগে এই মসজিদটির নির্মাণ শুরু হয়। সে সময় এলাকাটি ছিল নদী-নালাবেষ্টিত ও কৃষিনির্ভর। স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় চর্চা ও সামাজিক সংহতির কেন্দ্র হিসেবে একটি স্থায়ী ইবাদতখানার প্রয়োজনীয়তা থেকেই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মসজিদের নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা কাহিনী। কথিত আছে, প্রায় আড়াইশ বছর আগে শেরপুরের তৎকালীন তিনআনি জমিদার মুক্তাগাছার জমিদারকে দাওয়াত করেন। দাওয়াতে সাড়া দিয়ে মুক্তাগাছার জমিদার শেরপুরে এসে একটি স্থানে বিশ্রাম নেন। পরবর্তীতে সেই জায়গাটি তার পছন্দ হলে তিনি জমিটি নিজের নামে লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন। পরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জায়গাটি কোনো মুসলিম সাধকের নামে দান করবেন।
এরপর ইসলাম ধর্ম প্রচারক মীর আব্দুল বাকীর কাছে জায়গাটি প্রস্তাব করা হলে তিনি জানান, পুরো জমি নয়—মসজিদ নির্মাণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই তিনি গ্রহণ করবেন। তার অনুরোধ অনুযায়ী জায়গাটি তাকে দেওয়া হয় এবং সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হয়।
১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন মীর আব্দুল বাকী। তার মৃত্যুর পর মসজিদের সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেন তার স্ত্রী সালেমুন নেছা বিবি। তিনি সবসময় ধর্মীয় সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন এবং স্থানীয়রা তাকে স্নেহভরে ‘মা’ বলে ডাকতেন। সেই ‘মা’ শব্দ থেকেই মসজিদের নাম হয় মাইসাহেবা জামে মসজিদ।
মসজিদটি শেরপুর শহরের বাগরাকশা এলাকায় শেরপুর সরকারি কলেজের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। শেরপুর-জামালপুর বাসস্ট্যান্ড থেকেও এর দূরত্ব কম হওয়ায় দর্শনার্থীদের জন্য এটি সহজেই পৌঁছানো যায়।
স্থাপত্যের দিক থেকে মসজিদটিতে মুঘল আমলের প্রভাব লক্ষ করা যায়। মূল কাঠামো আয়তাকার এবং উপরে রয়েছে একাধিক অর্ধগোলাকৃতি গম্বুজ। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি তুলনামূলক বড় এবং পাশে ছোট গম্বুজগুলো স্থাপত্যের ভারসাম্য বজায় রেখেছে। মসজিদের প্রবেশপথে রয়েছে নান্দনিক খিলান এবং দরজা-জানালায় বাঁকানো নকশা, যা মুঘল আমলের শিল্পরুচির পরিচয় বহন করে।
মসজিদের দেয়াল অত্যন্ত পুরু এবং পোড়া ইট ও চুন-সুরকির মিশ্রণে নির্মিত। এতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এবং স্থাপনাটির স্থায়িত্বও বৃদ্ধি পায়। মসজিদের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে হুজরাখানা বা মুয়াজ্জিন কক্ষ। অজুর জন্য মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দুটি আলাদা স্থান রয়েছে, যেখানে দুই শতাধিক মুসল্লি একসঙ্গে অজু করতে পারেন।
মসজিদের সামনের খোলা মাঠে প্রতি বছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মুসল্লি এখানে সমবেত হন। রমজান মাসে প্রতিদিন প্রায় চারশ থেকে পাঁচশ মুসল্লি এখানে ইফতার করেন।
মসজিদটি নির্মাণ ও সংস্কারে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তার জন্য পুরো এলাকা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়েছে এবং পাহারার জন্য দুইজন কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, যথাযথ গবেষণা ও সংরক্ষণ করা হলে এই ঐতিহাসিক মসজিদটি জাতীয় ঐতিহ্যের মর্যাদা পেতে পারে। পাশাপাশি এটিকে ঘিরে পর্যটন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন সচেতন মহল।
সিএ/এমআর


