ইরানের বিভিন্ন অনলাইন সেবা, সরকারি প্ল্যাটফর্ম এবং সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি এই সাইবার তৎপরতা পরিচালিত হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এ হামলায় ইরানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট এবং জনপ্রিয় একটি ধর্মীয় ক্যালেন্ডার অ্যাপ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ‘বাদেসাবা’ নামে পরিচিত ওই অ্যাপটি দেশটিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং এখন পর্যন্ত এটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ ডাউনলোড করেছেন।
হ্যাকিংয়ের পর অ্যাপটিতে ব্যবহারকারীদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বার্তা প্রদর্শিত হতে থাকে। সেখানে ‘এখন হিসাব চুকানোর সময়’ এমন বার্তা দেখানোর পাশাপাশি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে অস্ত্র ত্যাগ করে জনগণের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এ বিষয়ে ‘বাদেসাবা’ অ্যাপটির প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। একইভাবে মার্কিন সাইবার কমান্ডের এক মুখপাত্রও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইন্টারনেট বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘কেনটিক’-এর পরিচালক ডগ ম্যাডরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জানান, গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৭টা ৬ মিনিট এবং পরে ১১টা ৪৭ মিনিটে ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারে বড় ধরনের পতন দেখা যায়। ওই সময় অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সেবা কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে।
সাইবার নিরাপত্তা গবেষক এবং ‘ডার্কসেল’ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হামিদ কাশফি বলেছেন, ‘বাদেসাবা’ অ্যাপটিকে লক্ষ্যবস্তু করা একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ এই অ্যাপটি ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং সরকারের কট্টর সমর্থকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়।
অন্যদিকে জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সমন্বিত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল করতে দেশটির সরকারি সেবা ও সামরিক অবকাঠামোর ওপরও সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। তবে এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘সোফোস’-এর থ্রেট ইন্টেলিজেন্স পরিচালক রেফ পিলিং বলেছেন, ইরান যখন নিজেদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবছে, তখন তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রক্সি গ্রুপ বা হ্যাকার দলগুলোর পক্ষ থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত সামরিক, বাণিজ্যিক কিংবা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঝুঁকি বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, এসব হামলার মধ্যে থাকতে পারে পুরোনো তথ্য চুরির ঘটনাকে নতুন করে প্রচার করা, ইন্টারনেটে উন্মুক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে সাধারণ ধরনের আক্রমণ চালানো কিংবা বড় ধরনের সাইবার অভিযানের চেষ্টা।
র্যানসমওয়্যার বিরোধী প্রতিষ্ঠান ‘হ্যালসিয়ন’-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের সাবেক শীর্ষ সাইবার কর্মকর্তা সিনথিয়া কায়সার জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে এ ধরনের সাইবার তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। তাদের প্রতিষ্ঠান পরিচিত ইরানপন্থী সাইবার ব্যক্তিত্বদের পক্ষ থেকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান লক্ষ্য করেছে।
তিনি বলেন, এসব হ্যাকার অতীতে চোরাই তথ্য ফাঁস, র্যানসমওয়্যার হামলা এবং ডিডিওএস আক্রমণ চালানোর জন্য পরিচিত। ডিডিওএস আক্রমণের মাধ্যমে অতিরিক্ত ট্রাফিক তৈরি করে ইন্টারনেট পরিষেবাকে অচল করে দেওয়া হয়।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাউডস্ট্রাইক’-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম মেয়ার্সের মতে, বর্তমান সাইবার তৎপরতা আরও বড় ধরনের বা আগ্রাসী অভিযানের পূর্বসংকেত হতে পারে। তিনি বলেছেন, “ইরানপন্থী হ্যাকার ও হ্যাকার দলগুলো এরইমধ্যে তথ্য সংগ্রহ ও ডিডিওএস আক্রমণ শুরু করেছে। আর এমন আলামত ক্রাউডস্ট্রাইক দেখতে পাচ্ছে।”
এদিকে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানোমালি’ জানিয়েছে, ইরান সরকারের মদদপুষ্ট হ্যাকাররা হামলার আগেই ইসরায়েলি বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ‘ওয়াইপার’ আক্রমণ চালাচ্ছে, যাতে সিস্টেমের সব ধরনের তথ্য মুছে ফেলা হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও চীনের পাশাপাশি ইরানকেও যুক্তরাষ্ট্রের নেটওয়ার্ক নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন।
সিএ/এমআর


