ক্রিয়েটিন সাপ্লিমেন্টের প্রতি আগ্রহ এখন তুঙ্গে। বহু বছর ধরে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বা ফিটনেস লেভেল যা–ই হোক, এটি শক্তি ও পেশি গঠনে সহায়ক। তবে গবেষকেরা এখন খুঁজছেন, কোষের শক্তি উৎপাদনে, বিশেষ করে মস্তিষ্কে, ক্রিয়েটিনের ভূমিকা কী এবং এটি কীভাবে স্মৃতিশক্তি, আরোগ্য ও ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল বা নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, ক্রিয়েটিন সাপ্লিমেন্ট হয়তো ঘুমের ব্যক্তিগত অনুভূত মান (সাবজেক্টিভ স্লিপ কোয়ালিটি), মানসিক পারফরম্যান্স ও উচ্চমাত্রার ব্যায়ামের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণায় ১৪ জন শারীরিকভাবে সক্রিয় পুরুষ অংশ নেন। এক সপ্তাহ ধরে তাঁরা প্রতিদিন ২০ গ্রাম ক্রিয়েটিন মনোহাইড্রেট বা প্লাসিবো গ্রহণ করেন। এটি ছিল ডাবল-ব্লাইন্ড ও ক্রসওভার ডিজাইন, অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীরা জানতেন না কখন আসল সাপ্লিমেন্ট নিচ্ছেন। ঘুম পর্যবেক্ষণের জন্য কবজিতে পরা অ্যাক্টিভিটি মনিটর ব্যবহার করা হয় এবং ঘুমের মান ও সার্বিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্নপত্র পূরণ করা হয়।
ফলাফল দেখিয়েছে, ক্রিয়েটিন গ্রহণের সময় অংশগ্রহণকারীরা ঘুমের মান ভালো মনে করেছেন। তাঁরা তুলনামূলকভাবে আগে বিছানায় গেছেন, মানসিক পারফরম্যান্স ও উচ্চমাত্রার ব্যায়ামের সক্ষমতা বেড়েছে, পেশির ব্যথা কম অনুভূত হয়েছে। তবে অবজেক্টিভ মাপে মোট ঘুমের সময়, স্লিপ এফিশিয়েন্সি বা ঘুমাতে সময় নেয়ার ক্ষেত্রে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। অর্থাৎ বেশি ঘুম হয়নি, কিন্তু ঘুম থেকে উঠে বেশি সতেজ বোধ হয়েছে। গবেষকেরা মনে করছেন, ক্রিয়েটিন শরীর ও মস্তিষ্কের শক্তি-নির্ভর প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা হলো এতে শুধুমাত্র পুরুষ অংশগ্রহণ করেছেন। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্র, হরমোনজনিত ওঠানামা এবং সার্কাডিয়ান রিদমের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতির সময়ে নারীদের জ্ঞানীয় সক্ষমতায় ক্রিয়েটিন উপকার করতে পারে। তবে নারীদের ঘুম, আরোগ্য ও মস্তিষ্কের শক্তি ব্যবস্থায় এর প্রভাব আরও নির্দিষ্টভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজন।
২০২৪ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র তিন ঘণ্টার ঘুমের পর উচ্চমাত্রার একবারের ক্রিয়েটিন ডোজ মস্তিষ্কের শক্তি বিপাকক্রিয়া দ্রুত উন্নত করতে পারে। তিন ঘণ্টার মধ্যেই উপকার দেখা যায়, চার ঘণ্টায় তা সর্বোচ্চে পৌঁছায় এবং প্রায় নয় ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। বিশেষ করে প্রসেসিং ক্ষমতা ও স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিতে উন্নতি লক্ষ করা যায়, যা ঘুমের অভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুটি গবেষণার মিলিত বার্তা হলো, ক্রিয়েটিন সরাসরি ঘুমের সময় বাড়ায় না, তবে শক্তির ঘাটতির চাপ থেকে মস্তিষ্ককে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। এটি তীব্র ব্যায়াম বা ঘুমের অভাব থেকে সৃষ্ট চাপ হোক। ভালো ঘুমের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই।
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন ৫ গ্রাম ক্রিয়েটিন মনোহাইড্রেট যথেষ্ট। অল্প সময়ের জন্য ১০–২০ গ্রাম ক্রিয়েটিন নেওয়া হয় লোডিং ফেজে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন উচ্চ মানসিক চাপ বা ঘুমের ঘাটতি। নিয়মিত গ্রহণে উপকার বেশি, মাঝেমধ্যে খেলে প্রভাব কম।
গবেষণার ছোট পরিসর ইঙ্গিত দিচ্ছে, ক্রিয়েটিন হয়তো বেশি সতেজ অনুভব করতে, মনোযোগ ধরে রাখতে এবং তীব্র ব্যায়ামে ভালো পারফর্ম করতে সাহায্য করতে পারে। এটি কোনো ‘ম্যাজিক পিল’ নয়। যারা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করেন বা মানসিকভাবে উচ্চচাপে থাকেন, তাঁদের জন্য ক্রিয়েটিন সহায়ক হতে পারে। সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
সিএ/এমআর


