মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যেই দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন ইরানের সাধারণ মানুষ। কোথাও হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ, আবার কোথাও আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী—এমন পরিস্থিতির মধ্যেই রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে দিন পার করছেন তারা।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক হামলায় নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কিছু পানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় আকারে পানি বা বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তবুও সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় জনগণকে পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে সরকার।
পূর্ব তেহরানের বাসিন্দা সেপেহর আলজাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধ হয়তো কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। তাই পরিস্থিতি খুব খারাপ না হলে আমি ও আমার পরিবার শহর ছাড়ব না। আপাতত জীবন চলছেই।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক বাসিন্দা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে তার এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে। কখনো আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়, আবার কখনো বিস্ফোরণের কম্পনে বাড়ির জানালাও কেঁপে ওঠে।
পশ্চিম তেহরানের বাসিন্দা মারজান বলেন, ‘কিছু সময়ের জন্য বোমাবর্ষণ থেমে গেলে আমি দিনে একবার কাছের দোকানে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনি। সাধারণত রুটির দোকানে লাইন থাকে, তবে খুব বড় নয়। কিছু পেট্রোল পাম্পেও লাইন দেখা যায়। তবে কয়েকটি পণ্যের ঘাটতি থাকলেও আপাতত দোকানে বেশির ভাগ জিনিসই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতে কী হবে কে জানে। জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।’
প্রায় এক কোটি মানুষের শহর তেহরানের বিভিন্ন এলাকাতেই এখন প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া হামলার পর দিন-রাত যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের আশঙ্কায় রয়েছে মানুষ। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
রাজধানীর রাস্তাঘাট এখন আগের তুলনায় অনেকটাই ফাঁকা। যানজটও কমে গেছে। অনেক দোকানপাট বন্ধ থাকলেও খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্য এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ সরাসরি দোকান থেকে বা অনলাইনে অর্ডার করেও পণ্য সংগ্রহ করছে।
এর মধ্যেই ইরানের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর দুই দিন আগে প্রকাশিত ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পৃথক প্রতিবেদনে দেখা যায়, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রায় ৯ কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। পরিসংখ্যান কেন্দ্র জানায়, ইরানি ক্যালেন্ডারের বাহমান মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৮ দশমিক ১ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬২ দশমিক ২ শতাংশ।
খাদ্যপণ্যের দামও দ্রুত বাড়ছে। গত মাসের শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১০৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ২০৭ শতাংশ, মাংস ১১৭ শতাংশ, ডিম ও দুগ্ধজাত পণ্য ১০৮ শতাংশ, ফল ১১৩ শতাংশ এবং রুটি ও ভুট্টার দাম বেড়েছে ১৪২ শতাংশ।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ইরানের ফার্স্ট ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ জানিয়েছেন, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে শুরুতে কিছু উদ্বেগ থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওষুধের বাজারে অস্থিরতা দেখা গেছে এবং কিছু ওষুধের সংকট তৈরি হয়েছে।
সরকার মানুষের জন্য ন্যূনতম নগদ ভর্তুকি কর্মসূচি চালু রেখেছে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারে। সম্প্রতি এই কর্মসূচির আওতায় কেনা যায় এমন পণ্যের তালিকায় শিশুদের ডায়াপারও যুক্ত করা হয়েছে, যার দাম গত কয়েক মাসে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলে জরুরি পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রাদেশিক গভর্নর ও মন্ত্রীদের কম আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বড় পরিমাণে পণ্য আমদানির ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
বোমাবর্ষণের মধ্যেই টানা ষষ্ঠ দিনের মতো বৈশ্বিক ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রেখেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। ফলে সাধারণ মানুষ মূলত রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও সরকারি বার্তার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
স্থানীয় সাংবাদিক মিলাদ আলাভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ৫৯টির বেশি ভিপিএন ও প্রক্সি কনফিগারেশন চেষ্টা করে ছয় ঘণ্টা পর এই টুইটটি পাঠাতে পারলাম।
তিনি আরও জানান, ইরানে স্থায়ী ও মোবাইল—দুই ধরনের ইন্টারনেটই বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তার ভাষায়, আমরা কোনো খবর পাচ্ছি না, অথচ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে ইরান যেন তেল আবিব ও ওয়াশিংটন দখলের দ্বারপ্রান্তে!
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ক্লাউডফ্লেয়ার ও নেটব্লকস জানিয়েছে, গত শনিবার রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে বিমান হামলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ তীব্রভাবে কমে যায়। ওই হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে জানা গেছে। এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিক অবস্থার এক শতাংশেরও কমে নেমে আসে।
নেটব্লকস জানিয়েছে, বর্তমানে ইরানে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে বৈশ্বিক ইন্টারনেটে সংযোগের চেষ্টা করলেও আইনি ব্যবস্থার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অনেক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, ভিপিএন ব্যবহারের চেষ্টা বা তা শেয়ার করার পর তারা টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের হুমকিমূলক বার্তা পেয়েছেন।
সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক চালু থাকায় স্থানীয় কিছু ওয়েবসাইট সীমিতভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। তবে সেখানে সরকারের সমালোচনা বাড়তে থাকায় প্রযুক্তিবিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট জুমিটের মন্তব্য বিভাগও বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিচার বিভাগ।
এদিকে রাজনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নাগরিকদের বারবার আহ্বান জানাচ্ছে—কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ বা মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দেখলে যেন তারা দ্রুত নিরাপত্তা বাহিনীকে জানায়।
সিএ/এএ


