মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতির মধ্যে ফ্লাইট স্বাভাবিক হলে গমনেচ্ছু প্রবাসীদের দ্রুত যাত্রার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ বিষয়ে প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় গত দুই দিনে বিভিন্ন দেশে দুই বাংলাদেশি নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সোমবার (৬ ডিসেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তিনটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আয়োজিত এ বৈঠকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়।
সংকট ঘিরে কূটনৈতিক যোগাযোগও জোরদার হয়েছে। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জারাহ জাবের আল আহমেদ আল সাবাহ, বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখি পৃথকভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে টেলিফোন করেন। চলমান পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যু ও সাতজনের আহত হওয়ার ঘটনায় কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও উদ্বেগ জানানো হয়। তাঁরা বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানানো হয়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হলে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে ইচ্ছুক যাত্রীদের দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সংকটকালীন সময়ে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংঘাতময় সময়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হচ্ছে অঞ্চলটিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা। বাংলাদেশিরা আক্রান্ত হলে, সেটা কাঁটাতারের বেড়ার এ পাশে হোক বা কাতারে গিয়ে হোক, সরকার তাঁদের পাশে দাঁড়াবে। সরকারের সবচেয়ে বড় জাতীয় স্বার্থ হচ্ছে জনগণ। এ সংঘাতে আর কোনো বাংলাদেশি হতাহত হবেন না বলে আশা করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশিদের স্বার্থ রক্ষা করা সরকারের প্রথম অবস্থান। বাংলাদেশ মনে করে না যুদ্ধ বা সংঘাত কোনো সমাধান। বাংলাদেশ চায়, অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার সমাধান হোক। যে আলোচনা থেমে গিয়েছিল, তা আবার নতুন করে শুরু করতে আহ্বান জানায় বাংলাদেশ।
ভিসা জটিলতায় পড়া প্রবাসীদের বিষয়ে আরিফুল হক চৌধুরী জানান, ভিসা–সংক্রান্ত বিষয়ে একটি সেল গঠন করা হয়েছে। যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, তাঁদের সহায়তা করতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিহতদের মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যখনই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, মরদেহ আনার ব্যবস্থা সরকার করবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার। আমরা উদ্ভূত পরিস্থিতির নিরসন চাই। এখানে কূটনীতির পথ অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। আর মধ্যপ্রাচ্যে যেসব বাংলাদেশি রয়েছেন এবং যাঁরা যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশে আটকে রয়েছেন, তাঁরা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে সিলেটের বড়লেখার সালেহ আহমেদ একটি বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলার ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে মারা গেছেন। সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাহরাইনে একজন বাংলাদেশি নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। মানামায় বাংলাদেশ মিশন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। কুয়েতে বেসামরিক বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন হামলায় চার বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের আমিনুল ইসলাম, পাবনার সাঁথিয়ার রবিউল ইসলাম, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের মাসুদুর রহমান ও কুমিল্লার চান্দিনার দুলাল মিয়া।
এ ছাড়া বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ দূতাবাস জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং সব ক্রু সদস্য নিরাপদে আছেন বলে জানানো হয়েছে।
সিএ/এমই


