বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পর্যায়ের প্রথম সফর হতে যাচ্ছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস পল কাপুর আগামী মঙ্গলবার ঢাকায় আসছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে ডোনাল্ড লু-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর এটি তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর। ঢাকা সফরের আগে তিনি দিল্লি সফর করবেন।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ৩ থেকে ৫ মার্চের এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি প্রাধান্য পাবে। নির্বাচনের পরপরই এই সফর হওয়ায় তা তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। অতীতে গণতন্ত্র ও নির্বাচন ইস্যুতে মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা ঢাকায় এলেও এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।
খসড়া সূচি অনুযায়ী, পল কাপুর মঙ্গলবার রাতে দিল্লি থেকে ঢাকায় পৌঁছাবেন। বুধবার (৪ মার্চ) সকালে তিনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করার কথা রয়েছে। সন্ধ্যায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। সফরের শেষ দিনে রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এটি হবে প্রথম জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পর্যায়ের সফর। ফলে আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের অগ্রাধিকার কী হবে, তা এই সফরে স্পষ্ট হতে পারে। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া, বাণিজ্যচুক্তির বাস্তবায়ন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের প্রসঙ্গ রয়েছে। সফরে ওই চিঠির আলোকে আলোচনা হতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্যচুক্তি গুরুত্ব পাবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জানা গেছে, সফরসঙ্গী হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা লরা অ্যান্ডারসনও ঢাকায় থাকবেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আরও কয়েক হাজার বাংলাদেশি ফেরত আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি চায় ওয়াশিংটন। জিসোমিয়া ও আকসা নামে দুটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষাচুক্তি সইয়ের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী। এর মধ্যে জিসোমিয়া নিয়ে আলোচনা অনেকটা এগিয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল এ বিষয়ে ঢাকায় আলোচনা করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, পল কাপুরের সফরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরালোভাবে আলোচিত হবে।
ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের বিষয়টিও সফরে উঠে আসতে পারে। চীনের প্রভাব মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকাকে ওয়াশিংটন গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনায় আসতে পারে। তবে ঢাকা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান তুলে ধরবে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভিসা ও বাণিজ্য ইস্যুতে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করায় পাল্টা শুল্কসংক্রান্ত চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানতে চাইবে ঢাকা। ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা বন্ডের তালিকা থেকে অব্যাহতি এবং বি-১ শ্রেণিতে ছাড়ের বিষয়টিও আলোচনায় তোলা হতে পারে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানাবে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট-এর প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে চিঠি দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট যে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বাংলাদেশকে অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। এখানে বাংলাদেশের ভূমিকা কেমন হবে, সেটা পল কাপুর বোঝার চেষ্টা করবেন। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের চিঠিতে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বিষয়টিও স্পষ্ট। তাই জিসোমিয়া ও আকসার মতো প্রতিরক্ষাচুক্তি যাতে দ্রুত সই হয়, সে বিষয়টিও এই সফরে পল কাপুর তুলবেন বলে ধারণা করা যায়।
সিএ/এমই


