কুমিল্লার দেবীদ্বারে অর্থের বিনিময়ে নিজ সন্তানকে দত্তক দিয়ে পরে অপহরণের অভিযোগ তোলার ঘটনা ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকা থেকে ২৭ দিন বয়সী এক শিশু কন্যাকে অপহরণের দাবি করা হয়। তবে তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য।
শিশুটির মা আকলিমা আক্তার দেবীদ্বার পৌর এলাকার বিনাইপাড় গ্রামের অটোচালক মো. কামাল হোসেনের স্ত্রী। অপহরণের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নজরে আসে শিশুটিকে দত্তক নেওয়া আবু সাঈদের।
আবু সাঈদ জানান, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে আমি বিব্রত। কারণ ওই নারী স্বেচ্ছায় তার বাচ্চা দত্তক দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে দেবীদ্বার সদরে অবস্থিত আল মদীনা হাসপাতালে এসে ওই হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ফিরোজ আহমেদ ও নার্স রহিমার সঙ্গে কথা বলে শিশুটিকে হস্তান্তর করে দিয়ে যান। পরে বাচ্চাটি নার্স রহিমা আক্তার আমার ঢাকার বাসায় পাঠিয়ে দেয়।
তিনি আরও জানান, আমি বিয়ের ১৭ বছরেও সন্তানের বাবা হতে পারিনি। তাই বিভিন্ন জায়গায় দত্তক দেওয়া বাচ্চার সন্ধানে অনেককে বলে রেখেছিলাম। আমার এক নিকট আত্মীয় রহিমা আক্তারের মাধ্যমে বাচ্চার সন্ধান পেয়ে জানান। বাচ্চার মায়ের ডিমান্ড ছিল এক লক্ষ টাকা, আমি বলেছিলাম ৫০ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, টাকা যাই হোক কন্টাক ফর্মে স্বাক্ষর করে টাকা নেওয়ার কথা ছিল। বাচ্চাটি পেয়ে আমাদের পরিবার খুবই আনন্দিত হয় এবং এ বাচ্চার জন্য গতকাল শুক্রবার বিকেলেই প্রায় ১৫ হাজার টাকার বস্ত্র ও মালামাল ক্রয় করে নিয়ে আসি। আর এদিকে ওই নারী অপহরণ নাটক সাজিয়ে গোটা দেশে তোলপাড় তৈরি করে দিয়েছে।
আল মদীনা হাসপাতালের নার্স রহিমা আক্তার জানান, বাচ্চার মা আকলিমা আক্তার আমার কাছে আসেন এবং তার বাচ্চাটি দত্তক দেওয়ার অনুরোধ করেন। তার স্বামী নেশাগ্রস্ত, আগের এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রয়েছে। তাদের ভরণপোষণ যোগাতে পারে না। এ বাচ্চাটি দত্তক দিয়ে দেব। আমার পরিচিত কয়েকজনকে বিষয়টি জানাই ওরা বাচ্চা পেয়ে গেছে, তাই তাদের প্রয়োজন নেই। পরে আবু সাঈদের কথা মনে পড়ে। আমি আবু সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি রাজি হয়ে যান। বাচ্চাটি নিয়ে আসলে তার স্বামীর খোঁজ নেই। তিনি বলেন, আগামী কাল স্বামীসহ এসে কন্টাক ফর্মে স্বাক্ষর করে টাকা নিয়ে যাবে।
ঘটনার আরেক দিক থেকে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টার দিকে বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি এলাকায় সড়কের পাশে আকলিমা আক্তারকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা জাতীয় সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে জানান। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবীদ্বার থানা পুলিশের উপস্থিতিতে স্বামী ও ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করে। তবে সঙ্গে থাকা শিশু কন্যাকে তখন পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় আকলিমার স্বামী কামাল হোসেন দেবীদ্বার থানায় অজ্ঞাতনামা ২/৩ জনকে আসামি করে অপহরণ মামলা দায়ের করেন।
আল মদীনা হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. ফিরুজ আহমেদ বলেন, ‘ওই মহিলা ৩ দিন এসেছে আমার কাছে, বাচ্চাটি দত্তক দিতে। কেন দত্তক দিতে চায় জানতে চাইলে সে জানায় তার স্বামী নেশাখোর, ভরণপোষন দিতে পারে না। আরো দুইটি বাচ্চা আছে। তাই এ বাচ্চাটি দত্তক দেবে। গতকাল দুপুরে আমি ডিউটি সেরে নিচে যাওয়ার পথে ওই মহিলা আমাকে ডেকে এনে বলেন, বাচ্চা দিয়ে দিছি। বললাম এমনে হবে না আপনার স্বামীকে নিয়ে এসে কন্টাক ফর্মে স্বাক্ষর করে দিতে হবে। আগামীকাল আসবে বলে চলে যান।’
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘অজ্ঞান পার্টি নাকি অপহরণকারীদের হাতে অপহৃত হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ভুক্তভোগী নারীকে গতকাল বিকেলে উদ্ধার করে তার স্বামী ও ভাইকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শিশু কন্যাকে পাওয়া যায়নি। অপহরণের সময় ওই নারীর কাছে টাকা ও মোবাইল ফোনটি ছিল। বাচ্চাটির সন্ধান পেয়েছি। বাচ্চা উদ্ধারের পর তদন্তের পূর্বে সঠিক কিছু বলা যাবে না।’
সিএ/এএ


