ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার সালামনগরে অবস্থিত ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর এখন নানা সংকটে ঘেরা। একদিকে সিলোনিয়া নদীর শাখাখালে তীব্র ভাঙন, অন্যদিকে দর্শনার্থী ও পাঠকের অনাগ্রহ—সব মিলিয়ে অবহেলার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ভাঙন এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই জাদুঘর ভবনটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে ভাষাশহীদ আবদুস সালামের উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতিস্মারক নেই। তাঁর নামে প্রকাশিত বই, একুশে পদকের অনুলিপি, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী বা তথ্যচিত্র—কিছুই প্রদর্শিত হচ্ছে না। ফলে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের মতো উপাদান অনুপস্থিত। একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে কিছুটা আগ্রহ তৈরি হলেও বছরের বাকি সময় স্থানটি প্রায় নিস্তব্ধ থাকে।
১৯২৫ সালে জন্ম নেওয়া আবদুস সালাম চাকরির সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগে কাজ করতেন তিনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হন। পরে ওই বছরের ৭ এপ্রিল হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করতেই প্রায় ১৮ বছর আগে গ্রামের নামকরণ করা হয় সালামনগর এবং সেখানে নির্মাণ করা হয় গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। পাশেই রয়েছে শহীদ মিনার ও ভাষাশহীদ আবদুস সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
২০২৪ সালের বন্যায় গ্রন্থাগারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত কাঠের বুকশেলফ সরিয়ে স্টিলের শেলফ বসানো হয়েছে। নতুন প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিল আনা হয়েছে এবং নষ্ট হওয়া বইয়ের বদলে নতুন বই সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বই রয়েছে সেখানে। নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। ফেনী জেলা পরিষদের অধীনে একজন গ্রন্থাগারিক ও একজন তত্ত্বাবধায়ক দায়িত্ব পালন করছেন।
গ্রন্থাগারিক মো. লুৎফুর রহমান বাবলু বলেন, পাঠক খুব একটা নেই। আশপাশের এলাকা থেকে সপ্তাহে দু-একজনের বেশি পাঠক বা দর্শনার্থী আসেন না।
জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক ফরিদ উদ্দিন জানান, ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়ক থেকে জাদুঘরে যাওয়ার সড়ক সংস্কার করা হলেও দূরবর্তী অবস্থানের কারণে মানুষ আসতে আগ্রহী হন না।
স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক হাসান বলেন, গ্রন্থাগারে আবদুস সালামের নামে প্রকাশিত কোনো বই নেই। সালাম যে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন, সেই পদক, ক্রেস্ট কিছুই নেই। কিছু দেখার নেই বলে দর্শনার্থীও নেই। আলমগীর হোসেন বলেন, ফেব্রুয়ারি এলেই সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিকেরা আসেন। এরপর আর কেউ খবর নেন না।
ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রমেন শর্মা বলেন, ‘পাঠকেরা যখন বইমুখী হবেন, তখন এ গ্রন্থাগারগুলো সক্রিয় হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু কর্মসূচি নিলেও, দীর্ঘ মেয়াদে পাঠক তৈরি না করা গেলে আপনারা (সাংবাদিকেরা) যে জিনিসটি চাইছেন, সেটি সম্ভব হবে না।’
এদিকে সিলোনিয়া নদীর শাখাখালে ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে আছেন স্থানীয়রা। দাগনভূঞা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহীদুল ইসলাম বলেন, ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
গ্রন্থাগার ভবনের পাশের শহীদ মিনারেও দেখা দিয়েছে ফাটল। বেদির একাধিক টাইলস ভেঙে গেছে। তবুও প্রতিবছরের মতো এবারও রোববার (৭ ডিসেম্বর) একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের প্রস্তুতি চলছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পাশাপাশি আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। সকালে আবদুস সালামের পরিবারের পক্ষ থেকেও সালামনগরের শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া হবে এবং জেলা প্রশাসনের আয়োজিত কর্মসূচিতে পরিবারের সদস্যরা অংশ নেবেন।
সিএ/এমই


