Saturday, June 13, 2026
28.1 C
Dhaka

শৈশবেই ধর্মীয় ভিত্তি গড়ে তোলার গুরুত্ব

সকালে অনেক অভিভাবকই এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হন, যা শুনে তারা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। সাত–আট বছরের একটি শিশু হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসে, মা, আল্লাহ কোথায়? আমি কেন তাঁকে দেখতে পাই না? এই স্বাভাবিক কৌতূহল থেকেই শুরু হয় বিশ্বাস, যুক্তি আর অনুভূতির এক গভীর আলোচনা।

অনেক সময় অভিভাবকেরা বাতাস বা অক্সিজেনের উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চান যে সব কিছু দেখা যায় না, তবু সেগুলো থাকে। কিন্তু বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে ওঠা শিশুরা কেবল এমন সহজ তুলনায় সন্তুষ্ট হয় না। তারা যুক্তিভিত্তিক ব্যাখ্যা খোঁজে এবং প্রশ্নের পেছনের কারণ বুঝতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কেবল তথ্য দেওয়া নয়, বরং তার হৃদয়ে বিশ্বাসের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করার প্রক্রিয়া। এই পরিচয়ের সূচনা হওয়া উচিত শৈশব থেকেই, যখন শিশুর মন সবচেয়ে বেশি গ্রহণক্ষম থাকে।

ইসলামি জীবনদর্শনে সাত বছর বয়স থেকে নামাজের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হলেও আল্লাহর পরিচয় তারও আগে শিশুর অন্তরে গেঁথে দেওয়া জরুরি। এক থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে অভ্যাসের মাধ্যমে শিক্ষা বেশি কার্যকর। খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলা, শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা কিংবা বৃষ্টির শব্দ শুনে সুবহানাল্লাহ বলা—এই ছোট অভ্যাসগুলো শিশুর অবচেতন মনে আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

আচরণগত শিক্ষার গুরুত্বও এখানে বড়। শিশুরা যা শোনে তার চেয়ে বেশি শেখে যা দেখে। অভিভাবকেরা যখন দোয়া করেন বা জিকির করেন, তখন শিশুরা তা অনুকরণ করতে চায়। এতে তাদের মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে আমাদের জীবনের সঙ্গে এমন একজন সত্তার সম্পর্ক আছে, যার কাছে আমরা সাহায্য চাই।

ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর আইয়্যুহাল ওয়ালাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শৈশব হলো কাদা মাটির মতো, এই সময়ে শিশুকে যেভাবে গঠন করা হবে, সেভাবেই তার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে।

যখন শিশু সরাসরি জানতে চায় কেন সে আল্লাহকে দেখতে পায় না, তখন বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। প্রথমত, স্রষ্টা ও সৃষ্টির উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, এই যে টেলিভিশন বা গাড়িগুলো দেখা যায়, এগুলো কি নিজে নিজে তৈরি হয়েছে? না, এগুলোর নির্মাতা আছে। তেমনি এই বিশাল পৃথিবী, সূর্য এবং তারকারাজিও কেউ একজন তৈরি করেছেন। আমরা সবসময় নির্মাতাকে দেখি না, কিন্তু তাঁর তৈরি কাজ দেখে বুঝি যে তিনি আছেন।

দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক ও অদৃশ্যের যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায় যে আমরা রাস্তায় সিসিটিভি ক্যামেরা দেখি, কিন্তু যারা সেই ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের সবসময় চোখে দেখি না। তবু আমরা জানি কেউ একজন পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। একইভাবে আল্লাহ তাআলা আমাদের দেখেন এবং মহাবিশ্ব পরিচালনা করেন, যদিও আমরা তাঁকে এই চোখে দেখতে পাই না।

তৃতীয়ত, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিশুকে বোঝানো জরুরি। আমরা খুব দূরের জিনিস দেখি না, আবার খুব ছোট জীবাণুও দেখতে পাই না। আল্লাহ এত মহান এবং তাঁর নূর এত প্রখর যে এই দুনিয়ার চোখ দিয়ে তাঁকে দেখার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে জান্নাতে ইনশাআল্লাহ মুমিনরা আল্লাহকে দেখতে পাবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ত করেন। সুরা আনআম, আয়াত: ১০৩।

শিশুর আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য পরিবারে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে জামাতে নামাজ হলে শিশুকে আজান বা ইকামতের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। সাত বছর বয়স হলে প্রয়োজনীয় সুরা জানা থাকলে মাঝে মাঝে তাকে ইমামতি করার সুযোগ দিলে তার মধ্যে ধর্মীয় আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

গল্পের ছলে শিক্ষা দেওয়াও কার্যকর পদ্ধতি। শোয়ার আগে নবী-রাসুলদের জীবনের ঘটনা বা কোরআনের শিক্ষামূলক কাহিনি শোনালে শিশু সহজেই তা গ্রহণ করে। বর্তমানে অ্যানিমেটেড ইসলামিক ভিডিওও পাওয়া যায়, যা পরিবারসহ দেখা যেতে পারে, তবে দেখার পর শিশুকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া এবং ধৈর্য ধরে উত্তর দেওয়াও জরুরি।

সমবয়সী শিশুদের নিয়ে ছোট পরিসরে পাঠচক্র বা হালাকা গড়ে তোলা হলে সেখানে ফেরেশতা, আখলাক এবং নবীদের জীবন নিয়ে আলোচনা করা যায়। সমবয়সীদের সঙ্গে আলোচনা করলে শেখার আগ্রহ আরও বাড়ে।

আল্লাহর রাসুল (সা.) শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) যখন ছোট ছিলেন, তখন নবীজি (সা.) তাকে বলেছিলেন, হে বৎস, তুমি আল্লাহর হুকুম রক্ষা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শিশুদের গভীর আধ্যাত্মিক বিষয়ও সহজ ভাষায় শেখানো সম্ভব। তবে স্কুল বা বাইরের পরিবেশ থেকে তারা অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়েও আসতে পারে। তখন বিরক্ত না হয়ে তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং যুক্তির মাধ্যমে সংশয় দূর করা জরুরি।

বিশ্বাসের পথে শিশুকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধৈর্য ও মমতা। কৌতূহল দমিয়ে না রেখে প্রজ্ঞার সঙ্গে তাকে পরিচালনা করাই অভিভাবকের দায়িত্ব। যখন শিশু বুঝতে শেখে যে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং সবসময় তার সঙ্গে আছেন, তখন তার মনে নিরাপত্তা ও শান্তির অনুভূতি তৈরি হয়।

অভিভাবক হিসেবে সন্তানের জন্য আল্লাহর সঙ্গে গভীর ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার পথ তৈরি করে দেওয়াই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) বলেছেন, সন্তানের হৃদয়ে স্রষ্টার ভালোবাসা প্রোথিত করাই হলো সর্বোত্তম উত্তরাধিকার।

সিএ/এমআর

spot_img

আরও পড়ুন

জাকাত ও কর কি একই বিষয়? যা বলছেন ইসলামি বিশেষজ্ঞরা

ইসলামে জাকাত একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত হওয়ায় অনেকের মনে...

স্ক্রিনে আসক্তি বাড়াচ্ছে মানসিক চাপ

মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের কথা উঠলে সাধারণত বড় কোনো...

জিন নয়, অভ্যাসই বার্ধক্যের বড় নিয়ামক

বার্ধক্যে অসুস্থতা ও অকাল মৃত্যুর জন্য শুধু বংশগত জিন...

তাকওয়া অর্জনে যেসব আমলকে গুরুত্ব দিতে বলছে ইসলাম

ইসলামে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি একজন মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ...

ডায়াবেটিস রোগীদের কাঁধের ব্যথার ঝুঁকি কেন বেশি

প্রতিদিনের জীবনের অসংখ্য কাজে কাঁধের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুল...

১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল, বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো...

অ্যামাজনের উর্বরতার পেছনে লুকিয়ে আছে সাহারার ভূমিকা

পৃথিবীর দুই প্রান্তে অবস্থান করা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূপ্রকৃতি—সাহারা...

পাঁচ মাসে সহিংসতার শিকার এক হাজারের বেশি নারী ও শিশু

চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে নারী ও শিশু...

শুধু এআইয়ের ওপর নির্ভর করে ধর্মীয় মাসআলা জানা কতটা গ্রহণযোগ্য?

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত...

গরমে ঘরে তৈরি করুন আম-লিচুর ঠান্ডা পুডিং

গ্রীষ্মকাল মানেই আম ও লিচুর মৌসুম। এই দুই জনপ্রিয়...

চীনের মহাপ্রাচীরে লুকিয়ে ছিল সৈন্য ও শ্রমিকদের জীবনের গল্প

চীনের মহাপ্রাচীরকে ঘিরে নতুন এক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে...

ইসলামি দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফল হওয়ার উপায়

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা সিদ্ধান্তে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে...

বিদ্যুৎ ছাড়াই পানি শীতল রাখার সহজ উপায়

গরমের সময়ে ঠান্ডা পানি সংরক্ষণের জন্য আবারও জনপ্রিয় হয়ে...

ডিএনএ পরীক্ষায় মিলতে পারে কেমোথেরাপির বিকল্প সিদ্ধান্ত

স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন...
spot_img

আরও পড়ুন

জাকাত ও কর কি একই বিষয়? যা বলছেন ইসলামি বিশেষজ্ঞরা

ইসলামে জাকাত একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত হওয়ায় অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়, রাষ্ট্রকে কর প্রদান করা কি আবশ্যক, নাকি কর ফাঁকি দিলে ধর্মীয়ভাবে কোনো...

স্ক্রিনে আসক্তি বাড়াচ্ছে মানসিক চাপ

মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের কথা উঠলে সাধারণত বড় কোনো সমস্যা, পারিবারিক সংকট বা কর্মক্ষেত্রের চাপের কথাই সামনে আসে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিনের জীবনের কিছু...

জিন নয়, অভ্যাসই বার্ধক্যের বড় নিয়ামক

বার্ধক্যে অসুস্থতা ও অকাল মৃত্যুর জন্য শুধু বংশগত জিন দায়ী নয়, বরং ব্যক্তির জীবনযাপন, পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভ্যাসই বড় ভূমিকা রাখে—এমন তথ্য উঠে এসেছে...

তাকওয়া অর্জনে যেসব আমলকে গুরুত্ব দিতে বলছে ইসলাম

ইসলামে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি একজন মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে বিবেচিত। এটি মানুষের অন্তরে এমন এক আত্মিক শক্তি সৃষ্টি করে, যা তাকে পাপ থেকে...
spot_img