২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের তুলনা তুলে ধরা হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ বইয়ের ‘গণঅভ্যুত্থানের কথা’ শিরোনামের গদ্যে এই তুলনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রণীত পাঠ্যবই ২০১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হয়। ওই শিক্ষাক্রমের শেষ দিকের শিক্ষাবর্ষের বইগুলো পরিমার্জন করে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন করে পাঠ্যবই প্রস্তুত করা হয়েছে। এই পরিমার্জিত বইতেই জুলাই আন্দোলনকে বড় পরিসরে যুক্ত করা হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ বলছেন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পথ উন্মুক্ত হয় এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মের ভিত্তি তৈরি হয়। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের তুলনা টানা যথাযথ হয়নি বলে তারা মনে করছেন।
পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হলেও জুলাই আন্দোলনকে কেবল ছাত্র-জনতার আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঊনসত্তর ও নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের তুলনায় ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরা হয়েছে।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং তাদের দুই শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নাম পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়নি। তিন জোটের কথা বলা হলেও জোটগুলোর নাম নেই। বিপরীতে, জুলাই আন্দোলনের বর্ণনায় বিস্তৃত আলোচনা যুক্ত করা হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ বইয়ের গদ্যে বলা হয়েছে, দুনিয়াজুড়ে সব কালে, নানা দেশে আমরা গণঅভ্যুত্থান ঘটতে দেখেছি। বাংলাদেশের নিকট-ইতিহাসেও এ রকম তিনটি বড় গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। প্রথমটি হয়েছিল ১৯৬৯ সালে, যা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। দ্বিতীয়টি ১৯৯০ সালে, যাকে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান বলা হয়, আর তৃতীয়টি হয়েছে একেবারে সম্প্রতি, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। অনেকেই একে জুলাই অভ্যুত্থান বা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান নামে অভিহিত করেছেন।
একই পাঠে আরও বলা হয়েছে, আগের দুই অভ্যুত্থানের সঙ্গে এবারের অভ্যুত্থানের একটা বড় পার্থক্য হলো, আগের দুবার শিক্ষার্থীরা প্রধান ভূমিকা রাখলেও আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে এরকম কোনও রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ছিল না। আন্দোলন পরিচালনা করেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ যুক্ত হয়।
নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ের ‘আমাদের গৌরবগাথা’ শিরোনামের গদ্যসাহিত্যে উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থান অভূতপূর্ব এক অভ্যুত্থান, যার পূর্বে নজির নেই। এই অভ্যুত্থান আমাদের জন্য এক অসাধারণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এটা কোনও দলের নেতৃত্বে হয়নি। কয়েকটি দলের জোটের মাধ্যমেও হয়নি। এখানে আন্দোলনকে কেবল ছাত্র-জনতার আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের গণআন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই আন্দোলন’ পাঠ্যে বলা হয়েছে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের মানুষ বারবার সংগ্রাম করেছে। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অনেক মানুষ নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার রক্ষার ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গণঅভ্যুত্থান’ পাঠে লেখা হয়েছে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান ও চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাৎপর্যপূর্ণ দুটি ঘটনা। গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার দাবিতে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সফল প্রতিফলন হলো এ দুটি অভ্যুত্থান।
নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ পাঠের ‘স্বাধীন বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান’ অংশে অর্থনৈতিক আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিছক কোনও সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা নয়। বরং এটা বাংলাদেশের জীবনে নতুন নাগরিক চেতনার উন্মেষ।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং বাংলা বইয়ে জুলাই আন্দোলন নিয়ে আলাদা পাঠ ও কবিতা যুক্ত হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের বইগুলোতেও জুলাই আন্দোলন নিয়ে লেখা ও কার্টুন বড় পরিসরে রাখা হয়েছে।
পাঠ্যবই পরিমার্জন প্রসঙ্গে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী জানান, পাঠ্যবই মুদ্রণের সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না এবং পরে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি এ বিষয়ে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর পাঠ্যবই পরিমার্জন বিষয়ে বক্তব্য দিতে চাননি। তবে এনসিটিবির সূত্রে জানা গেছে, পাঠ্যবই পরিমার্জনে ৫৭ জনের একটি এডিটরিয়াল প্যানেল কাজ করেছে এবং পরিমার্জনের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসি)।
পাঠ্যবই পরিমার্জনের সময় দায়িত্বে থাকা এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সিএ/এমআর


