মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গ্রহাণুকে অনেকদিন ধরেই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। আকাশের তারাদের ভিড়ে ভেসে বেড়ানো এসব পাথরের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে পৃথিবীর সোনার চেয়েও দামী উপাদান। প্রশ্ন হলো, এসব গ্রহাণু কি কেবল মহাকাশের আবর্জনা, নাকি ভবিষ্যতের গুপ্তধন।
দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহ, গ্রহাণু থেকে মূল্যবান খনিজ সংগ্রহ করে পৃথিবীতে আনা সম্ভব কি না। তবে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এসব গ্রহাণুর ভেতরের গঠন সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণার অভাব। সম্প্রতি স্পেনের ইনস্টিটিউট অব স্পেস সায়েন্সেসের একদল গবেষণা সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর করেছে। গবেষকদের মতে, মহাকাশ থেকে সম্পদ আহরণের বাস্তব সম্ভাবনা এখন আর কেবল কল্পবিজ্ঞান নয়।
এই গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কার্বনেশাস কনড্রাইট নামের বিরল উল্কাপিণ্ড। এগুলো আসে সি-টাইপ গ্রহাণু থেকে এবং পৃথিবীতে পতিত উল্কার মাত্র পাঁচ শতাংশ এই শ্রেণির। এসব উল্কা অত্যন্ত ভঙ্গুর হওয়ায় বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় অধিকাংশই ভেঙে যায়। সাহারা মরুভূমি ও অ্যান্টার্কটিকার মতো অঞ্চলে অল্প কিছু নমুনা তুলনামূলক ভালো অবস্থায় পাওয়া গেছে।
গবেষণা দলের নেতৃত্বদানকারী জোসেপ এম. ট্রিগো-রদ্রিগেজের ভাষায়, ‘এই পাথরগুলো আমাদের সৌরজগতের একদম শুরুর দিকের সাক্ষী। এগুলো পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে, এদের মূল গ্রহাণুটি আসলে কী দিয়ে তৈরি।’
এক দশকের বেশি সময় ধরে গবেষকেরা এসব উল্কাপিণ্ডের রাসায়নিক বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। মাস স্পেকট্রোমেট্রির মাধ্যমে তাঁরা খুঁজেছেন কোন উপাদানগুলো বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ গ্রহাণুতে মূল্যবান ধাতুর পরিমাণ খুবই কম।
গবেষক পাউ গ্রেবোল টমাস বলেন, ‘বেশিরভাগ অ্যাস্টেরয়েডে মূল্যবান ধাতুর পরিমাণ খুব সামান্য। তাই এত ব্যয়বহুল মিশন আদৌ লাভজনক হবে কি না, সেটাই আমাদের মূল প্রশ্ন।’
আরেক গবেষক জর্দি ইবানেজ-ইনসা জানান, অনেক গ্রহাণুর ওপর আলগা মাটির স্তর রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘রোবট পাঠিয়ে নমুনা আনা আর বাণিজ্যিকভাবে খনি খোঁড়ার মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। তবে মহাকাশে খনি খুঁড়লে পৃথিবীর পরিবেশের ওপর চাপ কমবে, যা বড় ইতিবাচক দিক।’
গবেষণার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আদিম গ্রহাণুতে এখনই খনি খোঁড়া খুব একটা যুক্তিসংগত নয়। তবে অলিভিন ও স্পিনেলের মতো খনিজসমৃদ্ধ গ্রহাণু ভবিষ্যতে লাভজনক লক্ষ্য হতে পারে। ভবিষ্যতে চাঁদ বা মঙ্গলে মানব বসতি গড়ে উঠলে, এসব গ্রহাণুই হতে পারে পানি ও জ্বালানির প্রধান উৎস।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, স্পেস মাইনিং শুধু সম্পদ আহরণেই সীমাবদ্ধ নয়। ট্রিগো-রদ্রিগেজের মতে, বিপজ্জনক গ্রহাণুতে খনি খুঁড়ে সেগুলোর আকার ছোট করা গেলে পৃথিবীর জন্য সম্ভাব্য হুমকিও কমানো সম্ভব।
সিএ/এমআর


