পানির বুক চিরে ছুটে চলছে আধুনিক নৌযান। তবে ভারী ইঞ্জিনের প্রচলিত শব্দ নয়, বরং হালকা এক শিসের মতো শব্দই জানান দিচ্ছে এর উপস্থিতি। পানির নিচে ডানার মতো ধাতব ফয়েলের সাহায্যে নৌযানটি ঢেউ কেটে নয়, বরং পানির ওপর উঠে ভেসে এগিয়ে যায়। এই প্রযুক্তির নাম হাইড্রোফয়েল। এতে নৌযানের হাল পানির ওপর উঠে আসায় পানির সঙ্গে ঘর্ষণ অনেক কমে যায় এবং তুলনামূলক কম শক্তি ব্যবহার করেই বেশি গতি পাওয়া সম্ভব হয়।
সুইডেনের স্টকহোমের জলপথে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হচ্ছে বৈদ্যুতিক হাইড্রোফয়েল ফেরি ‘ক্যান্ডেলা পি-টুয়েলভ নোভা’। এই ফেরিগুলো দ্রুতগামী, কম ঢেউ সৃষ্টি করে এবং দুলুনি কম হওয়ায় যাত্রীদের অস্বস্তিও তুলনামূলকভাবে কম হয়। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হাইড্রোফয়েল প্রযুক্তির ধারণা নতুন নয়। নৌযানের গতি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ১৮৭০-এর দশকেই এই প্রযুক্তির জন্ম হয়। সময়ের সঙ্গে এটি হারিয়ে গেলেও বর্তমানে পরিবেশবান্ধব জলযান তৈরির সমাধান হিসেবে আবার আলোচনায় এসেছে। বৈদ্যুতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে হাইড্রোফয়েল প্রযুক্তি জলপথে পরিবহনকে করছে আরও নীরব, দ্রুত ও পরিবেশসম্মত। এতে জ্বালানি সাশ্রয়, শব্দদূষণ কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইতিহাস বলছে, ১৮৬৯ সালে ফ্রান্সের উদ্ভাবক ইমানুয়েল ডেনি ফারকো প্রথম হাইড্রোফয়েল নৌযানের পেটেন্ট নেন। পরে ১৯০৬ সালে ইতালির লেক মাজিওরে এনরিকো ফরলানিনি সফলভাবে একটি হাইড্রোফয়েল নৌকা চালান। টেলিফোনের উদ্ভাবক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলও এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর তৈরি এইচডি-৪ নামের নৌযান একসময় ঘণ্টায় ১১৩ কিলোমিটার গতির বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ব্যাটারি, হালকা কম্পোজিট উপকরণ, সেন্সর ও মাইক্রোকম্পিউটার প্রযুক্তির উন্নতির কারণেই হাইড্রোফয়েলের পুনরুত্থান সম্ভব হয়েছে। যদিও বড় আকারের নৌযানে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং দীর্ঘপথে চার্জিং ব্যবস্থা এখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তবু শব্দদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে ভবিষ্যতের জলপথে এই ‘উড়ন্ত’ নৌযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএ/এমআর


