রাত গভীর হলে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অথচ অনেক ঘরে তখন নাক ডাকার বিকট শব্দে বিরক্তি তৈরি হয়। কখনো কখনো এই শব্দ এত তীব্র হয় যে মনে হয় কানের পাশেই কোনো যন্ত্র চলছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যিনি নাক ডাকছেন তিনি নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে থাকেন। প্রশ্ন জাগে, এত জোরে শব্দ হলেও নিজের নাক ডাকার আওয়াজে নিজের ঘুম ভাঙে না কেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষের নাক ডাকার শব্দের মাত্রা ১১০ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে, যা একটি করাতকলের শব্দের চেয়েও বেশি। তবুও অনেক সময় সেই ব্যক্তি গভীর ঘুমেই থাকেন। তবে মাঝে মাঝে নাক ডাকা ব্যক্তিও নিজের শব্দে ক্ষণিকের জন্য জেগে ওঠেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি সেন্টার ফর টিএমজে অ্যান্ড স্লিপ থেরাপির চিকিৎসক মণীশ শাহের মতে, নাক ডাকার শব্দে ঘুম ভাঙে ঠিকই, কিন্তু সেই জাগরণ সাধারণত কয়েক সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হয় না।
২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নাক ডাকা ব্যক্তিরা রাতে চার থেকে পাঁচবার জেগে ওঠার কথা মনে রাখতে পারেন। তবে যাদের স্লিপ অ্যাপনিয়া রয়েছে, তারা শ্বাসকষ্টের কারণে রাতে বহুবার জেগে উঠলেও সকালে উঠে তা মনে রাখতে পারেন না। এই ক্ষণিক জাগরণকে বলা হয় মাইক্রো-অ্যারোজাল। মস্তিষ্ক এসব স্বল্প সময়ের জাগরণকে স্মৃতিতে ধরে রাখে না।
মানুষের মস্তিষ্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিল্টার ব্যবস্থা রয়েছে, যার নাম থ্যালামাস। এটি ঠিক করে দেয় কোন শব্দ ঘুমের মধ্যে গুরুত্ব পাবে আর কোনটি উপেক্ষিত হবে। যেমন, রাস্তার ট্রাফিকের শব্দ বা ফ্যানের আওয়াজকে থ্যালামাস সাধারণত কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ফিল্টার করে দেয়। কিন্তু কেউ নাম ধরে ডাকলে বা বিপদসংকেতের শব্দ হলে তাৎক্ষণিকভাবে মস্তিষ্ককে জাগিয়ে তোলে। নাক ডাকার শব্দও অনেক সময় এই ফিল্টারে আটকে যায়, ফলে ঘুম ভাঙে না।
এ ছাড়া মস্তিষ্কের আরেকটি ক্ষমতা হলো সেন্সরি গেটিং। মানুষ যখন নিজেই কোনো শব্দ তৈরি করে, মস্তিষ্ক আগে থেকেই সেই সংকেত সম্পর্কে জানে। যেমন নিজের সুড়সুড়িতে সাধারণত হাসি পায় না। একইভাবে অবচেতন মন বুঝতে পারে নাক ডাকার শব্দ নিজের শরীর থেকেই আসছে এবং এটি বিপজ্জনক নয়। তাই মস্তিষ্ক এই শব্দের তীব্রতা কম গুরুত্ব দেয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় করোলারি ডিসচার্জ।
চিকিৎসকদের মতে, নাক ডাকা শুধু বিরক্তিকর নয়, এটি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের হেনরি ফোর্ড মেডিকেল সেন্টারের স্নায়ু বিশেষজ্ঞ ভার্জিনিয়া স্কিবা জানান, চিৎ হয়ে ঘুমালে শ্বাসনালির ওপর মাধ্যাকর্ষণের চাপ বাড়ে এবং বাতাস চলাচলের পথ সরু হয়ে যায়, ফলে নাক ডাকার প্রবণতা বাড়ে। পাশ ফিরে ঘুমালে এই সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।
তীব্র নাক ডাকা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণও হতে পারে। এই রোগে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। গুরুতর ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সিপ্যাপ মেশিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন, যা শ্বাসনালি খোলা রাখতে সহায়তা করে এবং ঘুমের মান উন্নত করে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মস্তিষ্ক নিজের তৈরি শব্দকে তুলনামূলকভাবে উপেক্ষা করে, কিন্তু বাইরের শব্দকে দ্রুত গুরুত্ব দেয়। তাই নিজের নাক ডাকার শব্দে অনেক সময় নিজের ঘুম ভাঙে না, যদিও এটি শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হতে পারে।
সিএ/এমআর


