Wednesday, June 3, 2026
34.8 C
Dhaka

তুর্কি উসমানি সুলতানদের ঐতিহ্যের নিদর্শন তোপকাপি প্রাসাদ

তুরস্কের উসমানি সুলতানরা একসময় মক্কা, মদিনা, বাগদাদ ও জেরুজালেমসহ দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, রাশিয়া, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করতেন।

সেই বিশাল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক তোপকাপি প্রাসাদ। মর্মর সাগর, বসফরাস প্রণালি ও গোল্ডেন হর্ন খাঁড়ি বেষ্টিত একটি মনোরম উপদ্বীপের পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত এই প্রাসাদটি আজও উসমানি ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে।

বর্তমান ইস্তাম্বুল শহরের এই উপদ্বীপটি ১৪৫৩ সালের আগে কনস্টান্টিনোপল নামে পরিচিত ছিল এবং এটি ছিল একটি খ্রিষ্টানপ্রধান নগরী। ওই বছর উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের নেতৃত্বে শহরটি বিজয়ের পর বাইজেন্টাইন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের ওপর তোপকাপি প্রাসাদের নির্মাণ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী সুলতানরা প্রাসাদের পরিসর ও সৌন্দর্য বাড়ান। তোপকাপি শব্দের অর্থ কামানের গেট; একসময় প্রাসাদের একটি বড় ফটকের নাম থেকেই এই নামকরণ হয়। তুর্কি ভাষায় এটি ‘টপকাপু সারাই’ নামেও পরিচিত।

ওসমানি সাম্রাজ্যের শাসনকাল ছিল প্রায় ৬২৫ বছর। ১৮৫৩ সালে সুলতান আবদুলমেচিদ ইউরোপীয় নকশায় নির্মিত দোলমাবাচে প্রাসাদে বসবাস শুরু করলে তোপকাপির গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে আসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানি রাজবংশের পতনের পর ১৯২৪ সালে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক তোপকাপি প্রাসাদকে জাদুঘরে রূপান্তর করেন এবং সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।

১৫১৭ সালে আব্বাসীয় খলিফাদের কাছ থেকে মিশর ও আরব ভূখণ্ডের ক্ষমতা সুলতান সেলিমের হাতে আসার পর ইসলামের বহু পবিত্র নিদর্শন তোপকাপি প্রাসাদে সংরক্ষিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর পবিত্র দাড়ি, জুব্বা, পাগড়ি, স্যান্ডেল, পানির পাত্র, তরবারি, ধনুক, পতাকা, চিঠি ও পায়ের ছাপসহ তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন। এছাড়া এখানে ইব্রাহিম (আ.)-এর ব্যবহৃত পাত্র, ইউসুফ (আ.)-এর পাগড়ি, মুসা (আ.)-এর লাঠি, দাউদ (আ.)-এর তরবারি ও ইয়াহিয়া (আ.)-এর পুথিও সংরক্ষিত রয়েছে।

প্রাসাদের উত্তর পাশে অবস্থিত সুরক্ষিত ও বিলাসবহুল হারেম ছিল সুলতানের ব্যক্তিগত জীবনের কেন্দ্র। এখানে সুলতানের মা, স্ত্রী, পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রায় ৩০০ উপপত্নী ও দাসী বসবাস করতেন। হারেম শব্দের অর্থ নিষিদ্ধ; সুলতান ও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠজন ছাড়া অন্য কারও সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। হারেমের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ছিলেন তুর্কি ও আফ্রিকান খোজা প্রহরীরা।

তোপকাপি প্রাসাদ চারটি প্রধান চত্বর ও হারেমে বিভক্ত। দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে চত্বরগুলোর গুরুত্ব ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পায়। প্রথম চত্বরটি ছিল সবচেয়ে উন্মুক্ত, যেখানে সাধারণ মানুষও প্রবেশ করতে পারত। দ্বিতীয় ও তৃতীয় চত্বর ছিল প্রশাসনিক ও রাজকীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র। সবচেয়ে উত্তরের চতুর্থ চত্বর ও হারেম ছিল সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং সুলতানের একান্ত ব্যক্তিগত এলাকা। একসময় এই প্রাসাদে চার থেকে পাঁচ হাজার কর্মচারী বসবাস ও কাজ করতেন। প্রাসাদের বিশাল রন্ধনশালায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য খাবার প্রস্তুত করা হতো।

সিএ/এসএ

spot_img

আরও পড়ুন

পুশইনের অভিযোগ ঘিরে সীমান্ত সফরে এনসিপি নেতার কর্মসূচি

ভারত থেকে বাংলাদেশে কথিত জোরপূর্বক পুশইনের ঘটনার প্রতিবাদ এবং...

যে সফলতা বাবা-মার ভালোবাসা ভুলিয়ে দেয়, সেটা আমাদের প্রয়োজন নেই

ইসলামি স্কলার ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেছেন,...

কালীগঞ্জে সড়কের ধারে মিলল শ্রমিকের মরদেহ

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় সড়কের পাশ থেকে সাইফুল ইসলাম (৫০)...

দুর্গাপুরে মাদক সেবনের সময় ধরা পড়লেন দুই সহোদর

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় মাদক সেবনের সময় দুই সহোদর ভাইকে...

টাঙ্গাইলে ছাত্র আন্দোলনের মামলার আসামি আটক

টাঙ্গাইলের সখীপুরে পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি মো. ফজলুল...

যাত্রী ওঠানোকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, ছাতকে সংঘর্ষ

সুনামগঞ্জের ছাতকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাত্রী ওঠানোকে কেন্দ্র করে দুই...

দুর্ঘটনার ছয় ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার নববধূ

যুক্তরাষ্ট্রে বিয়ের আনন্দ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিণত হয়েছে শোকে।...

ভিডিও ফুটেজে শনাক্ত, একাধিক গ্রেপ্তার

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের...

দক্ষিণ লেবাননে কৌশলগত দুর্গ দখল করল ইসরায়েল

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে...

বোমা হামলার পরও অক্ষত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা

ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা আকাশপথের...

পশ্চিমবঙ্গে একদিনে ৩৫ মন্ত্রী শপথ নিচ্ছেন

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের সম্প্রসারণের ঘোষণা দেওয়া...

খনির উপকরণ বিস্ফোরণে রক্তাক্ত মিয়ানমারের গ্রাম

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত একটি গ্রামে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত...

আকাস জোটের নতুন উদ্যোগ, নজর সাবমেরিন কেবল সুরক্ষায়

সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো সুরক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও...

ইরান নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন মন্তব্য করেছেন...
spot_img

আরও পড়ুন

পুশইনের অভিযোগ ঘিরে সীমান্ত সফরে এনসিপি নেতার কর্মসূচি

ভারত থেকে বাংলাদেশে কথিত জোরপূর্বক পুশইনের ঘটনার প্রতিবাদ এবং সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে বেনাপোল সীমান্ত সফরে যাচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন...

যে সফলতা বাবা-মার ভালোবাসা ভুলিয়ে দেয়, সেটা আমাদের প্রয়োজন নেই

ইসলামি স্কলার ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেছেন, এমন কোনো সফলতা সমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না, যা একজন মানুষকে তার বাবা-মায়ের প্রতি...

কালীগঞ্জে সড়কের ধারে মিলল শ্রমিকের মরদেহ

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় সড়কের পাশ থেকে সাইফুল ইসলাম (৫০) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মরদেহে আঘাতের বিভিন্ন চিহ্ন পাওয়া যাওয়ায় ঘটনাটিকে ঘিরে...

দুর্গাপুরে মাদক সেবনের সময় ধরা পড়লেন দুই সহোদর

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় মাদক সেবনের সময় দুই সহোদর ভাইকে আটক করেছে পুলিশ। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড...
spot_img