রোজার দিন শেষ করে ইফতারের সময় অনেকেই হঠাৎ করে শরীরে ক্লান্তি বা ঘুমঘুম ভাব অনুভব করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, সারাদিন না খেয়ে থাকার পর একসঙ্গে ভারী খাবার গ্রহণের ফলে শরীরে নানা ধরনের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে, যা ক্লান্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারে অনেক সময় অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, মিষ্টি বা ভারী খাবার খাওয়া হয়। এতে হঠাৎ করে পাকস্থলীর ওপর চাপ পড়ে যায়। দ্রুত খাবার খাওয়ার কারণে অন্ত্রে হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এবং গ্যাস বা প্রদাহের মতো সমস্যা তৈরি হয়। এর ফলে শরীর নিস্তেজ অনুভূত হয়।
পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হলেও শরীর খাবার থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে পেট ভরে খাওয়ার পরও দুর্বলতা বা ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতারের সময় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করলে শরীরে সেরোটোনিন নামের নিউরোট্রান্সমিটারের উৎপাদন বেড়ে যেতে পারে। সেরোটোনিন ঘুমের চক্র, আবেগ, ক্ষুধা এবং হজম প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশেষ করে কার্বোহাইড্রেট বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে এর মাত্রা বাড়ে, যা ঘুমঘুম ভাব সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার শরীরে ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত মিষ্টি বা শর্করাযুক্ত পানীয় গ্রহণ করলেও একই প্রভাব পড়ে। শরীর তখন ইনসুলিন নিঃসরণ করে অতিরিক্ত গ্লুকোজ কমানোর চেষ্টা করে। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে যেতে পারে, যা শক্তির ঘাটতি ও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে বেশি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন লাল মাংস, মুরগি, মাছ, শিম, পনির বা বাদাম খাওয়া হয়, তখন শরীর শক্তির জন্য প্রোটিনকে গ্লুকোজে রূপান্তর করতে পারে। এতে রক্তে শর্করার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে এবং ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
রোজার সময় পরিপাকতন্ত্রে রক্তপ্রবাহ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কিন্তু ইফতারের পর হজম ও পুষ্টি শোষণের জন্য পাকস্থলী ও অন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায়। এর ফলে শরীরের অন্য অঙ্গ, বিশেষ করে মস্তিষ্ক ও মাংসপেশিতে রক্তপ্রবাহ কিছুটা কমে যেতে পারে। এতে ঘুমঘুম ভাব ও অবসাদ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইফতারের পর ক্লান্তি কমাতে খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। পরিশোধিত চিনি ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার কম খাওয়াও ভালো।
ইফতার শুরু করা যেতে পারে একটি খেজুর ও এক গ্লাস পানি দিয়ে। এরপর কয়েক মিনিট বিরতি নিয়ে ধীরে ধীরে পরিমিত পরিমাণে খাবার গ্রহণ করা ভালো। একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে খেলে হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে।
রমজান মাসে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং হালকা শারীরিক নড়াচড়া ইফতারের পর ক্লান্তি কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সিএ/এমআর


