দৈনন্দিন জীবনে অলসতা অনেকের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কখনো কাজ শুরু করতে দেরি, কখনো মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা—সব মিলিয়ে সময় ও সক্ষমতার অপচয় ঘটে। জাপানিদের কর্মসংস্কৃতি ও জীবনযাপনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিক চর্চার মাধ্যমে তারা অলসতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। তাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে, যা কাজে মন বসাতে এবং আত্মউন্নয়নের পথে এগোতে সহায়তা করে।
এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ধারণা হলো ইকিগাই, অর্থাৎ বেঁচে থাকার কারণ। জাপানিরা মনে করেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠার জন্য যদি কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য না থাকে, তাহলে কাজের প্রতি আগ্রহও তৈরি হয় না। ইকিগাই মানুষকে প্রতিদিন নতুন উদ্যমে শুরু করতে সাহায্য করে এবং অলসতা কাটিয়ে ওঠার ভেতরের শক্তি জোগায়। সাধারণত চারটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মাধ্যমে ইকিগাই নির্ধারণ করা হয়—যে কাজ আনন্দ দেয়, যে কাজে নিজের দক্ষতা আছে, যে কাজ সমাজের জন্য উপকারী এবং যে কাজের জন্য পারিশ্রমিক পাওয়া যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন হলো কাইজেন, যার অর্থ প্রতিদিন সামান্য হলেও উন্নতির চেষ্টা করা। বড় পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা না করে ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে এগিয়ে নেওয়াই কাইজেনের মূল কথা। প্রতিদিনের ছোট লক্ষ্য পূরণের অভ্যাস অলসতা কমায় এবং কাজের প্রতি ধারাবাহিকতা তৈরি করে।
সময় ব্যবস্থাপনায় কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয় পোমোদোরো টেকনিক। এই পদ্ধতিতে ২৫ মিনিট একটানা মনোযোগ দিয়ে কাজ করার পর অল্প বিরতি নেওয়া হয়। এতে মনোযোগ বাড়ে, কাজের চাপ কম লাগে এবং কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা হ্রাস পায়। নিয়মিত এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে কাজের প্রতি আগ্রহ ও উৎপাদনশীলতা দুটোই বাড়ে।
ওয়াবি-সাবি দর্শন শেখায় অপূর্ণতাকে মেনে নিতে। সব কিছু নিখুঁত হবে—এই চাপ থেকে বেরিয়ে এসে কাজের প্রক্রিয়াকে উপভোগ করাই এর মূল শিক্ষা। কাজের ফল নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে ধাপে ধাপে এগোলে মানসিক চাপ কমে এবং কাজে স্থায়িত্ব আসে।
শোশিন বা শেখার মানসিকতা মানুষকে সব সময় নতুনভাবে শুরু করার সাহস দেয়। নিজেকে সবজান্তা না ভেবে শিক্ষানবিশের মতো ভাবলে শেখার আগ্রহ বাড়ে। এই মানসিকতা কাজের প্রতি কৌতূহল ও প্রেরণা তৈরি করে, যা অলসতা দূর করতে সহায়ক।
শিনরিন-ইয়োকু, যাকে সহজভাবে ‘বন স্নান’ বলা হয়, মানে প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় কাটানো। সবুজ পরিবেশে থাকলে মানসিক চাপ কমে, মন ভালো থাকে এবং কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সংস্পর্শে এলে স্ট্রেস হরমোন কমে যায়, যা অলসতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
সবশেষে রয়েছে হারা হাচি বু, অর্থাৎ পেট ৮০ শতাংশ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত খাওয়া। অতিরিক্ত খাবার শরীরকে ক্লান্ত করে তোলে এবং কাজের আগ্রহ কমায়। পরিমিত খেলে শরীরের শক্তি স্থিতিশীল থাকে, সারাদিন কাজ করার সক্ষমতা বজায় থাকে এবং অলসতা কমে।
সিএ/এমআর


