শৈশবেই নানা কেমিক্যালের সংস্পর্শ শিশুর দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও প্রতিরোধব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিকশিত না হওয়ায় এসব বিষাক্ত উপাদান শরীরে সহজে নিষ্ক্রিয় করা বা বের করে দেওয়া সম্ভব হয় না। উপরন্তু শিশুর কোষকলা বিষাক্ত দ্রব্যের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় অল্প বয়সেই ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ২ হাজার ৮৬৩ ধরনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল উৎপাদিত হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশে বিষক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব কেমিক্যাল বায়ু, পানি, খাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং ধীরে ধীরে জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
বায়ুদূষণকারী কেমিক্যালের মধ্যে বাতাসে ওজোন, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনো-অক্সাইডের মাত্রা বেশি হলে শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, হাঁপানি এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি তেলাপোকা, বিড়াল ও কুকুরের মতো অ্যালার্জেনও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বাড়ায়।
সিসা শিশুর জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক। শিশুর দেহে সিসার মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায় এবং মেধার বিকাশ ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
মারকারির সংস্পর্শে এলে ত্বক, মাড়ি ও মুখে ঘা, মাংসপেশির অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া এবং স্নায়ুকোষের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। হ্রদের মাছ মারকারিতে বেশি দূষিত হতে পারে বলে গর্ভবতী নারীদের খাদ্যতালিকায় এসব মাছ না রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এর প্রভাব ভ্রূণের ওপরও পড়তে পারে।
এসবেস্টস একসময় শ্রেণিকক্ষের দেয়াল ও সিলিং নির্মাণে ব্যবহৃত হতো, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। তামাকের ধোঁয়ার পরোক্ষ প্রভাবেও শিশু কম ওজন, অ্যাজমা ও কান পাকা রোগে আক্রান্ত হতে পারে, আর গর্ভাবস্থায় ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলে ভ্রূণের নানা ত্রুটি দেখা দিতে পারে।
পেস্টিসাইডস বা কীটনাশক পোকামাকড়, মশা, মাছি ও ইঁদুর দমনে ব্যবহৃত হলেও এগুলো মারাত্মক বিষাক্ত। এসব কেমিক্যাল ফলমূল ও শাকসবজির মাধ্যমে খাবারে মিশে শিশুর বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
পিসিবি, ডিডিটি ও বিভিন্ন হাইড্রোকার্বন পরিবেশে দীর্ঘদিন জমে থাকতে পারে এবং দূষিত মাছ বা বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর দেহে প্রবেশ করে। এতে ভ্রূণ ও অল্প বয়সী শিশুরা বেশি ক্ষতির শিকার হয়।
কিছু বিষাক্ত কেমিক্যাল হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে, যার মধ্যে রয়েছে ডিইএস, ডিডিটি, পিসিবিএস ও ডিমোক্সিন। এর ফলে কন্যাশিশুর অকাল মাসিক, অস্বাভাবিক স্তন বিকাশ, শুক্রাশয় ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রতিরোধের জন্য শিশুকে ঘরে তৈরি টাটকা ও তাজা খাবার খাওয়ানো জরুরি। ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে খাওয়াতে হবে। টিনের পাত্রে রাখা খাবার, ফাস্ট ফুড, রঙিন জুস বা কৃত্রিম পানীয় শিশুকে না দেওয়াই নিরাপদ।
শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ধোঁয়ামুক্ত স্কুল পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিদিন সকালে ট্যাপের পানি ২ থেকে ৩ মিনিট ছেড়ে দিয়ে তারপর পান করার অভ্যাস করলে পানির ভেতরে জমে থাকা ক্ষতিকর উপাদান কমে যায়।
সিএ/এমআর


