ফরিদপুরের বোয়ালমারীর সাতৈর গ্রামে এক হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম হয়েছে। এক হাতে দুধভরা ফিডার আর অন্য হাতে দাদির শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে থাকা ছোট্ট মুসলিমা ইসলামের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। দুধ আর কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে তার জীবনে। মাত্র ২৫ মাস বয়সেই সে হারিয়েছে বাবা-মা দুজনকেই।
জানা গেছে, জন্মের ২১ দিন পরই মা আরিফা বেগম তাকে রেখে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে দাদা শাহিদ শেখ ও দাদি নার্গিস বেগমের কাছেই বেড়ে উঠছিল শিশুটি। কিন্তু গত শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় জনতার গণপিটুনিতে নিহত হন তার বাবা, ট্রাকচালক হান্নান শেখ (৪৩)।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) বিকেলে হান্নান শেখের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। উঠানজুড়ে স্বজনদের আহাজারি, নারীদের বুকফাটা কান্না আর মানুষের ভিড়ে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। এর মাঝেই কখনো দাদির কোলে, কখনো স্বজনদের কোলে ঘুরতে থাকে মুসলিমা। কখনো চুপচাপ ফিডারের দুধ খায়, আবার হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুসলিমার মা তার জন্মের ২১ দিন পর স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যান। এরপর থেকে দাদা-দাদিই তার দেখাশোনা করছেন। দাদি নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মা ২১ দিনেই চলে গেছে, এখন বাপও নাই। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি না থাকলে ও কোথায় যাবে? তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমার ছেলের মাথা ৪-৫ ভাগ করেছে, হাত-পা ভেঙে ফেলা হয়েছে, শরীরের কোথাও দাগ ছাড়া নাই। আমার ছেলেকে গুজব ছড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
নিহতের বাবা শাহিদ শেখ বলেন, আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। সে অপরাধ করে থাকলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এখন এই বাচ্চার ভবিষ্যৎ কী হবে?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় দ্রুতগতির একটি ট্রাক কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেয়—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। পরে ‘ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে’—এই গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
একপর্যায়ে স্থানীয়রা ইট-ব্লক ফেলে সড়ক অবরোধ করে ট্রাকটি থামায়। পরে চালক হান্নান শেখকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) দুপুরে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হয় এবং বাদ আসর সাতৈর শাহী জামে মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে তাকে সাতৈর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠায়। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নিহত পরিবারের দাবি, গুজব ছড়িয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হান্নানকে হত্যা করা হয়েছে। তারা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
সিএ/এমই


