একসময় ঘন সবুজ অরণ্যে আচ্ছাদিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ব্যাপক বন উজাড়ের ফলে ন্যাড়া ও অনুর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারে বন নিধন, অপরিকল্পিত জুম চাষ, কাঠ পাচার ও ইটভাটার বিস্তারে গত কয়েক দশকে পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রোববার (৭ ডিসেম্বর) প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট প্রায় ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির মধ্যে একসময় প্রায় ১১ লাখ ৫ হাজার ৩৫৩ হেক্টর এলাকা বনভূমিতে আচ্ছাদিত ছিল, যা মোট এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে বর্তমানে এসব এলাকার প্রায় ৯৫ শতাংশ বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বন উজাড়ের ফলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে, শুকিয়ে যাচ্ছে ঝিরি-ঝর্ণা এবং তীব্র হচ্ছে পানির সংকট। একই সঙ্গে বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় সাত লাখ ১০ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমি ‘ইউনক্লাসড স্টেট ফরেস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত, যা কার্যত অরক্ষিত। ফলে এসব এলাকায় বন উজাড়ের হার তুলনামূলক বেশি। গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর জুম চাষে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর এবং অন্যান্য কারণে আরও প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর বনভূমি উজাড় হচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ১৬ হাজার ৬৪৪ হেক্টর সংরক্ষিত বনভূমি অবৈধ দখলে রয়েছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্যকে আরও বিপন্ন করে তুলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে ন্যাড়া পাহাড় পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। রোয়াংছড়ি উপজেলার প্রু কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাসহ কয়েকজন বাসিন্দা মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে ফলজ ও বনজ গাছ লাগানো হলে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে আসবে এবং পানির উৎস পুনরুদ্ধার হবে।
বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. আবু জাফর বলেন, গত কয়েক দশকে নির্বিচারে বন উজাড় হলেও পর্যাপ্ত বনায়ন হয়নি, যার ফলে পানি সংকট ও পাহাড়ধসের ঘটনা বেড়েছে। তিনি মনে করেন, ন্যাড়া পাহাড়ে বনায়ন হলে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, পরিকল্পিত বনায়ন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, ফল সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ এবং সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী বলেন, ‘টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পিত বনায়ন এবং পর্যটনের সমন্বিত উন্নয়ন হলে পার্বত্য এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার বড় পরিবর্তন সম্ভব।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, কার্যকর বন ব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল ও কাঠ পাচার বন্ধ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে।
সিএ/এএ


