সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগে ইসলামি ইতিহাসে সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায়, যার মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ইসলামের বিস্তারের পথ উন্মুক্ত হয়। আরব উপদ্বীপে ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় হওয়ার পর মুসলিম বাহিনী আফ্রিকা মহাদেশের দিকে অগ্রসর হয়। এই অভিযানের সূচনা ঘটে মিসরকে কেন্দ্র করে, যা পরবর্তীকালে পুরো উত্তর আফ্রিকার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের বিস্তারের প্রথম পর্যায়ের নেতৃত্ব দেন মহান সাহাবি হজরত আমর ইবনুল আস (রা.)। বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের পর তিনি মিসরের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে তৎকালীন খলিফা হজরত উমর (রা.) এ অভিযানের অনুমতি দেন। ২০ হিজরি, অর্থাৎ ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে আধুনিক কায়রোর নিকটবর্তী ফুস্তাতকে কেন্দ্র করে মুসলিম বাহিনীর অভিযান শুরু হয়।
ফুস্তাতে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রোমান দুর্গ দীর্ঘ ছয় মাস অবরোধের পরও দখল করা সম্ভব না হলে খলিফা হজরত উমর (রা.) হজরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.)-এর নেতৃত্বে অতিরিক্ত ১০ হাজার সৈন্য পাঠান। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আক্রমণে দুর্গটি দখলে আসে। এরপর মুসলিম বাহিনী আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে অগ্রসর হয়।
মুসলিমদের অগ্রযাত্রার খবর পেয়ে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস আলেকজান্দ্রিয়ায় বড় একটি সেনাবাহিনী পাঠান। ‘কারবিউন’ এলাকায় উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে মুসলিম বাহিনী বিজয় অর্জন করে। এরপর আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ আরও সুগম হয়।
ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, সে সময় আলেকজান্দ্রিয়ার দুর্গে বিপুলসংখ্যক রোমান সেনা অবস্থান করলেও স্থানীয় কিবতি (কপ্টিক) খ্রিস্টানদের একটি বড় অংশ যুদ্ধের পক্ষে ছিল না। স্থানীয় নেতা মুকাউকিস জিজিয়া কর মেনে নিতে অনীহা প্রকাশ করলে হজরত আমর ইবনুল আস (রা.) তাকে উদ্দেশ করে বলেন, “তোমাদের মনে রাখা উচিত যে, সংখ্যার আধিক্যের সাথে আমাদের এই বিজয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্রাট হেরাক্লিয়াস যখন আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁর সেই বিশাল ও সুসজ্জিত বাহিনীর জাঁকজমক কেমন ছিল তা তোমরা খুব ভালো করেই জানতে এবং সেই সংঘাতের ফলাফল কী হয়েছিল তাও তোমাদের অজানা নয়।”
ঐতিহাসিক বিবরণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আলেকজান্দ্রিয়ার স্থানীয় কিবতি জনগোষ্ঠীর একাংশ মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা সহজ করতে রাস্তা ও সেতু মেরামতেও সহযোগিতা করেছিল। একই সময়ে সম্রাট হেরাক্লিয়াসের মৃত্যুর ফলে রোমান বাহিনী আর উল্লেখযোগ্য সহায়তা পায়নি।
আলেকজান্দ্রিয়ার অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় খলিফা হজরত উমর (রা.) আমর ইবনুল আস (রা.)-এর কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি বলেন, “হয়তো মিসরের আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতা তোমাদেরকে খ্রিস্টানদের মতো অলস ও আরামপ্রিয় করে তুলেছে; অন্যথায় বিজয় এত দীর্ঘ সময় বিলম্বিত হতো না।” এই বার্তার পর মুসলিম বাহিনী নতুন উদ্যমে অভিযান পরিচালনা করে এবং শেষ পর্যন্ত শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে বিজয় অর্জন করে।
আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়কে ঘিরে প্রচলিত একটি কাহিনিতে বলা হয়, শহরের ঐতিহাসিক গ্রন্থাগারের বই পুড়িয়ে হাম্মামের চুল্লি জ্বালানো হয়েছিল। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদদের গবেষণায় এ দাবি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, আলেকজান্দ্রিয়ার প্রধান টলেমিক লাইব্রেরি মুসলিম বিজয়ের বহু শতাব্দী আগেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং পরবর্তী ছোট গ্রন্থাগারটিও রোমান আমলে বিলুপ্ত হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই কাহিনির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ইবনে আল-কিবতির লেখায়, যিনি ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লেখক যাচাই-বাছাই ছাড়াই সেই বর্ণনা অনুসরণ করেন।
আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের পর হজরত আমর ইবনুল আস (রা.) ফুস্তাতে ফিরে এসে একটি গ্যারিসন শহরের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে আধুনিক কায়রো নগরীতে পরিণত হয়। ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহাসিক ‘মসজিদে আমর ইবনুল আস’, যা আজও মিসরের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ হিসেবে পরিচিত। এরপর মিসরের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করা হয়।
উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের স্থায়ী ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন হজরত উকবা ইবনে নাফি। তিনি মিসর থেকে লিবিয়া, ফিজান, কাওয়ার, ঘাদামেস, গাফসা ও জারেদ অঞ্চল পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেন। পাশাপাশি পশ্চিম আফ্রিকার দিকে মুসলিমদের অগ্রযাত্রার পথও সুগম করেন।
৬৭০ খ্রিস্টাব্দে তিনি তিউনিসিয়ায় কাইরুয়ান নগরীর ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এটি উত্তর আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় আফ্রিকার অন্যতম প্রাচীন মসজিদ ‘মসজিদে কাইরুয়ান’। বর্তমানে শহরটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় কাইরুয়ান প্রতিষ্ঠাকে ঘিরে একটি লোকগাথারও উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, বসতি স্থাপনের আগে উকবা ইবনে নাফি বন্য প্রাণী ও বিষাক্ত সাপকে এলাকা ত্যাগের আহ্বান জানান এবং পরবর্তী সময়ে এলাকাটি বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠে। তবে এ ঘটনা ঐতিহাসিক বিবরণ ও লোককথার অংশ হিসেবে পরিচিত।
৬৮১ খ্রিস্টাব্দে উকবা ইবনে নাফি আরও পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে মরক্কো হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত পৌঁছান বলে মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে আলজেরিয়ার তাহুদা এলাকায় বাইজেন্টাইন ও বারবারদের সম্মিলিত বাহিনীর অতর্কিত হামলায় তিনি এবং তাঁর প্রায় ৩০০ সঙ্গী শাহাদাতবরণ করেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, উত্তর আফ্রিকার সম্পূর্ণ বিজয় তখনও শেষ না হলেও উকবা ইবনে নাফির অভিযান এবং কাইরুয়ান নগরীর প্রতিষ্ঠা এ অঞ্চলে ইসলামের স্থায়ী ভিত্তি গড়ে তোলে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উত্তর আফ্রিকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে এর প্রভাব অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: ড. ইয়াসির ক্বাদির অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত বক্তব্য অবলম্বনে
সিএ/এমআর


