প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি ইসলামে কিছু সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব নামাজ নিয়মিত আদায় করলে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পাশাপাশি জান্নাতে বিশেষ প্রতিদানের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি দিন-রাতে নিয়মিত ১২ রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করবেন, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন।
ফরজ নামাজের সঙ্গে সম্পর্কিত সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজের মধ্যে রয়েছে—ফজরের ফরজের আগে দুই রাকাত, জোহরের ফরজের আগে চার রাকাত ও পরে দুই রাকাত, মাগরিবের ফরজের পরে দুই রাকাত এবং এশার ফরজের পরে দুই রাকাত। সব মিলিয়ে এই ১২ রাকাত সুন্নত নামাজের গুরুত্ব বিভিন্ন সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
উম্মুল মুমিনীন উম্মে হাবীবা (রা.) বর্ণনা করেন, “যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে ১২ রাকাত (সুন্নত) নামাজ পড়বে, এর প্রতিদানে জান্নাতে তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এই নামাজ সম্পর্কে শোনার পর থেকে আর কখনও তা পরিত্যাগ করিনি।”
একই হাদিসের ধারাবাহিকতায় আমবাসা ইবনে আবু সুফিয়ান (রহ.), আমর ইবনে আওস (রহ.) এবং নুমান ইবনে সালেম (রহ.) প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, তাঁরা এই ফজিলতের কথা জানার পর আর কখনও এসব সুন্নত নামাজ ত্যাগ করেননি। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৭২৮)
অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “দিন ও রাতে যে ব্যক্তি ১২ রাকাত (সুন্নত) নামাজ পড়বে, জান্নাতে তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করা হবে।” এরপর তিনি এই ১২ রাকাতের বিবরণ দেন—জোহরের আগে চার রাকাত, জোহরের পরে দুই রাকাত, মাগরিবের পরে দুই রাকাত, এশার পরে দুই রাকাত এবং ফজরের আগে দুই রাকাত। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৪১৫)
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা এসেছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি ১২ রাকাত সুন্নত নামাজ নিয়মিত আদায় করবে, জান্নাতে তার জন্য আল্লাহ তায়ালা একটি ঘর নির্মাণ করবেন।” (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৪১৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১১৪০)
ফজরের দুই রাকাত সুন্নত সম্পর্কে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী (সা.) অন্য সব নফল নামাজের তুলনায় ফজরের দুই রাকাত সুন্নতের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতেন এবং তা নিয়মিত আদায় করতেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১১৬৯)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “তোমরা (ফজরের) দুই রাকাত (সুন্নত নামাজ) ছাড়বে না। যদিও তোমাদের পেছনে ঘোড়া (অশ্বারোহী) ধাওয়া করে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৯২৫৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১২৫২)
জোহরের আগের চার রাকাত সুন্নত সম্পর্কেও একাধিক হাদিসে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) জোহরের আগে চার রাকাত এবং ফজরের আগে দুই রাকাত নামাজ কখনও ছাড়তেন না। (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১১৮২)
আলী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) জোহরের আগে চার রাকাত এবং জোহরের পরে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৪২৪)
আরেক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনও জোহরের আগের চার রাকাত সুন্নত সময়মতো আদায় করতে না পারলে ফরজ ও পরবর্তী দুই রাকাত সুন্নত শেষে তা পড়ে নিতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১১৫৮)
জুমার নামাজের ক্ষেত্রেও সুন্নতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জুমার ফরজের আগে চার রাকাত এবং পরে চার রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “যে গোসল করে জুমায় আসে, এরপর তাওফিক মতো নামাজ পড়ে, এরপর ইমাম খুতবা শেষ করা পর্যন্ত চুপ থাকে এবং তার সাথে নামাজ পড়ে। তার পরবর্তী জুমা পর্যন্ত ও আরও অতিরিক্ত তিন দিনের (গুনাহ) মাফ করে দেওয়া হয়।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৭)
অন্য হাদিসে তিনি বলেন, “যে জুমা পড়ল, সে যেন জুমার পর চার রাকাত নামাজপড়ে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৮৮১)
তাবেয়ী আবু আবদুর রহমান আসসুলামী (রহ.) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) জুমার আগে চার রাকাত এবং পরে চার রাকাত নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিতেন। পরে আলী (রা.) আগমন করলে তিনি জুমার পরে প্রথমে দুই রাকাত এবং এরপর চার রাকাত নামাজ পড়ার নির্দেশ দেন। (মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, হাদিস: ৫৫২৫)
ইসলামি শরিয়তে এসব সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ নিয়মিত আদায়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অকারণে এসব নামাজ ত্যাগ না করে নিয়মিত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের কল্যাণ অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
সিএ/এমআর


