সৌদি আরবের জেদ্দা শহরের কর্নিশ এলাকায় অবস্থিত আল-জাজিরা মসজিদ, যা আর-রাহমা মসজিদ নামেও পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরেই অনন্য স্থাপত্যশৈলীর জন্য পরিচিত। সমুদ্রের ওপর নির্মিত এই মসজিদকে ঘিরে রয়েছে বিস্ময়কর এক নির্মাণগাঁথা। একসময় সমুদ্রের ঢেউ মসজিদের নিচের মাটি ধুয়ে নিয়ে গেলেও ভবনটিতে কোনো ফাটল দেখা যায়নি। ফলে এটি আধুনিক স্থাপত্যের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলীর শক্তিমত্তারও এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রখ্যাত মিশরীয় স্থপতি আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিল সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এই মসজিদ নির্মাণের পেছনের নানা অজানা গল্প তুলে ধরেন। তিনি জানান, জেদ্দা কর্নিশের এক শীতের সকালে একটি পৌরসভার গাড়ি রাস্তার বড় একটি গর্তে পড়ে গেলে বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে। পরে দেখা যায়, সমুদ্রের ঢেউ মসজিদের নিচের বালু ধুয়ে নিয়ে গেছে এবং ভবনের নিচে কার্যত কোনো মাটিই অবশিষ্ট নেই। অথচ পুরো স্থাপনাটি অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল।
ঘটনার খবর পেয়ে জেদ্দার মেয়র ও প্রকৌশলীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ভবনটি যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হলেও বাস্তবে তার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। সে সময় আল-ওয়াকিল রসিকতার ছলে বলেছিলেন, মসজিদটি যেন ফেরেশতারাই ধরে রেখেছেন। তবে তাঁর মতে, এর পেছনে ছিল ঐতিহ্যবাহী নির্মাণপ্রযুক্তির অসাধারণ শক্তি ও নকশাগত দক্ষতা।
আল-ওয়াকিল জানান, আল-জাজিরা মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল একটি প্রবাল দ্বীপের ওপর। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান সেখানে রড ও কংক্রিট ব্যবহার করে প্রায় ৪০ মিটার গভীর ভিত্তি নির্মাণের পরামর্শ দিলেও তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেন। রড ও সিমেন্টের পরিবর্তে ইট, পোড়ামাটি এবং গম্বুজভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলী ব্যবহার করে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।
তিনি বলেন, সমুদ্রের আর্দ্রতা, প্রবল ঢেউ এবং ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই এই নকশা তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে যখন সমুদ্রের ঢেউ মসজিদের নিচে বড় গহ্বর তৈরি করেও ভবনটিতে কোনো ক্ষতি করতে পারেনি, তখন ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলীর কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জেদ্দায় এই সফলতার পর আল-ওয়াকিলকে মদিনার ঐতিহাসিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মসজিদের সংস্কার ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে মসজিদে কুবা, মসজিদে কিবলাতাইন এবং মিকাত জিল হুলাইফা উল্লেখযোগ্য।
মসজিদে কুবার সংস্কারকাজের একটি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, এক বৃদ্ধ ব্যক্তি কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই নির্মাণকাজে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে সরিয়ে দিলে তিনি বলেন, “তোমরা কি ভাবছ তোমরাই এই মসজিদ বানাচ্ছ? চারদিকে তাকিয়ে দেখ, ফেরেশতারা এখানে তাওয়াফ করছে এবং তারাই এই মসজিদ নির্মাণ করছে।”
আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিলের মতে, স্থাপত্য কেবল প্রকৌশল বা ভবন নির্মাণের বিষয় নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং নৈতিক দায়িত্বেরও বহিঃপ্রকাশ। ইতালীয় শিল্পী সিলভিও বিকি এবং প্রখ্যাত স্থপতি হাসান ফাতির কাছ থেকে তিনি ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলীর গুরুত্ব শিখেছেন।
তিনি মনে করেন, মানুষের হাতের কাজই একটি স্থাপনায় প্রাণ সঞ্চার করে। তাই কংক্রিটনির্ভর আধুনিক নির্মাণের পরিবর্তে তিনি কাদা, ইট ও প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, দক্ষ রাজমিস্ত্রির হাতে নির্মিত প্রতিটি দেয়ালে এমন এক ধরনের কল্যাণ ও সৌন্দর্য তৈরি হয়, যা যান্ত্রিক নির্মাণে পাওয়া যায় না।
আল-ওয়াকিলের স্থাপত্যকর্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে। আলেকজান্দ্রিয়ার হালাওয়া হাউসের জন্য তিনি আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ইসলামিক স্থাপত্য গবেষণায় কিং ফাহাদ পুরস্কার, আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের সম্মানসূচক ফেলোশিপ এবং ক্ল্যাসিকাল স্থাপত্যে অবদানের জন্য রিচার্ড ড্রেইহাউস পুরস্কারেও ভূষিত হন। ব্রিটেনের রাজা চার্লসও তাঁকে অক্সফোর্ড ইসলামিক সেন্টারের নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
সূত্র: আল জাজিরা
সিএ/এমআর


