ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেও ন্যায়ভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সম্পদের সুষম বণ্টন, বৈধ উপায়ে উপার্জন এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলাম কিছু মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করেছে। এসব নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।
অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সুদ নিষিদ্ধ করা। সুদভিত্তিক লেনদেনের ফলে সম্পদ ধনী শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং ঋণগ্রস্ত মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে। এর ফলে সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান আরও বিস্তৃত হয়।
এ কারণেই পবিত্র কোরআনে সুদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫)
দ্বিতীয়ত, ইসলাম ঘুষকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ঘুষের মাধ্যমে যোগ্যতার পরিবর্তে অন্যায় সুবিধা প্রতিষ্ঠিত হয়, ন্যায়বিচার ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বৈষম্য ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। ফলে সমাজে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টন বাধাগ্রস্ত হয়।
হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) বিচার-ফয়সালার ক্ষেত্রে ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহণকারী উভয়ের ওপর লানত করেছেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩৬)
তৃতীয়ত, ইসলাম জুয়াকে শয়তানি কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কারণ জুয়ার মাধ্যমে পরিশ্রম বা উৎপাদন ছাড়াই সম্পদের স্থানান্তর ঘটে। এতে একজন অল্প সময়ে বিপুল অর্থের মালিক হলেও অন্যজন সর্বস্ব হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ে। এই প্রক্রিয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও জুয়ার তিরসমূহ ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানি কাজ। সুতরাং এসব পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা মায়েদাহ, আয়াত: ৯০)
চতুর্থত, ইসলাম মজুতদারির বিরোধিতা করেছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্য মজুত রাখলে বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়। অন্যদিকে অল্পসংখ্যক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে সম্পদের বৈষম্য বাড়িয়ে তোলে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুত করে (কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে), আল্লাহ–তাআলা তাকে কুষ্ঠরোগ এবং দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৫৫)
পঞ্চমত, ইসলাম অপচয় ও অপব্যয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। অপ্রয়োজনীয় খাতে সম্পদ ব্যয় করলে সমাজের দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সম্পদের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ ওড়ায়, তারা শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭)
ইসলামের এসব অর্থনৈতিক নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে সমাজে ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ধনী-গরিবের ব্যবধান কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশও শক্তিশালী হবে।
সিএ/এমআর


