পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে সুপেয় পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস জলাশয়গুলো ধীরে ধীরে তাদের ধারণক্ষমতা হারাচ্ছে। নদী থেকে আসা পলি, বালি ও ছোট ছোট পাথর জমে জলাশয়ের তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় পানি ধরে রাখার জায়গা কমে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৬০ সালের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি সুপেয় পানির জলাশয় কার্যকারিতা হারাতে পারে।
চীনের চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের গবেষকদের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, নদীতে বাঁধ নির্মাণের কারণে স্বাভাবিকভাবে পলি, বালি ও নুড়ি পাথর নিচের দিকে প্রবাহিত হতে পারে না। ফলে এগুলো জলাশয়ের তলদেশে জমা হয়ে পানি সংরক্ষণের জায়গা সংকুচিত করে ফেলছে। এতে শুধু পানির সংকট নয়, নদীর নিম্নাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গবেষক কাই লিউ ও তাঁর সহকর্মীরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি জলাশয়ের স্যাটেলাইট ছবি, পলি জমার তথ্য এবং মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই গবেষণা পরিচালনা করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর পলি জমার কারণে পৃথিবীর জলাশয়গুলো প্রায় ৩৬ কিউবিক কিলোমিটারের বেশি পানি ধারণের ক্ষমতা হারাচ্ছে। এই পরিমাণ পানি চীনের বিশাল থ্রি জর্জেস জলাশয়ের ধারণক্ষমতার কাছাকাছি। গবেষকদের মতে, কোনো জলাশয়ের অর্ধেকের বেশি অংশ পলিতে ভরে গেলে সেটিকে কার্যকরভাবে প্রায় অচল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও স্পেন। ২০৬০ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৮৫ শতাংশ জলাশয় কার্যকারিতা হারাতে পারে। স্পেনের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৭৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
শুষ্ক ও মরু অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এসব অঞ্চলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জলাশয় আগামী কয়েক দশকের মধ্যে অকার্যকর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে আর্দ্র অঞ্চলেও প্রায় অর্ধেক জলাশয় একই সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে।
গবেষণা অনুযায়ী, নামিবিয়ার প্রায় ৯৯ শতাংশ বাঁধ পলি জমার কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলেও এই ঝুঁকির হার প্রায় ৯৬ শতাংশ। প্রতি দশকে পৃথিবীর সুপেয় পানি সংরক্ষণের ক্ষমতা ৭ শতাংশের বেশি কমছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাশয়ের ধারণক্ষমতা কমে গেলে বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটির বেশি মানুষের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশের বেশি সেচযোগ্য জমি পানির সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমস্যা মোকাবিলায় গবেষকেরা নদীর উজানে বনায়ন, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং মাটির ক্ষয় রোধের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে জলাশয়ে অতিরিক্ত পলি প্রবাহ কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ইয়ান রাইট জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে। এতে পলি জমার হার আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই বাড়তি মানুষের পানির চাহিদা পূরণে জলাশয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি এগুলোর ধারণক্ষমতা কমতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পলি জমা হলো একটি ক্যানসারের মতো। এটি ধীরে ধীরে জলাশয়ের পানি ধারণক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। মাটি খুবই ভঙ্গুর। বাঁধের চারপাশের গাছপালা কেটে ফেলার কারণে মাটির ক্ষয় দ্রুত বাড়ছে। এটি জলাশয়গুলোয় অনবরত পলি জমার উৎস হিসেবে কাজ করছে।
সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট
সিএ/এমআর


