খেলাধুলাকে রাজনীতির বাইরে রাখার কথা প্রায়ই শোনা যায়। তবে বাস্তবতা বলছে, বিশ্বমঞ্চের বড় আয়োজনগুলোতে ক্রীড়া ও রাজনীতি বহু সময় একে অন্যের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলে। আর ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজন হলে সেই সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে বসেছে এবারের ফিফা বিশ্বকাপ। ইতিহাসে প্রথমবার তিনটি দেশ যৌথভাবে এই আয়োজন করছে। একই সঙ্গে এটিই সবচেয়ে বড় পরিসরের বিশ্বকাপ। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে এবং অনুষ্ঠিত হচ্ছে মোট ১০৪টি ম্যাচ, যা আগের আসরের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে কয়েকটি বিষয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ছিল—ইরান দল আদৌ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে কি না, কিংবা সমর্থকরা মাঠে গিয়ে খেলা দেখতে পারবেন কি না।
শেষ পর্যন্ত ইরান দল শর্তসাপেক্ষে ভিসা পেলেও সমর্থকদের যাত্রা সীমিত হয়ে পড়ে। দলটিকেও তাদের বেজক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে মেক্সিকোতে সরিয়ে নিতে হয়। শুরুতে সীমিত সময়ের প্রবেশ অনুমতির আলোচনা থাকলেও পরে কিছুটা শিথিলতা আসে এবং ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়।
বিশ্বকাপ ঘিরে আরেকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে ম্যাচ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুল কাদির আরতান বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। তার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ আনা হয়। যদিও পরবর্তীতে দেশে ফিরে তিনি সংবর্ধনা পান এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাগুলোও তার ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ নেয়।
তবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল আয়োজক তিন দেশের মধ্যকার সম্পর্ক। বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য তারা একসঙ্গে আবেদন করলেও বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপড়েন বহুদিনের।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে তিন দেশের নেতাদের একসঙ্গে দেখা গেলেও বাস্তবে বাণিজ্য, অভিবাসন, শুল্কনীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে। তিন দেশের ১৬টি শহরে ম্যাচ আয়োজন হলেও গুরুত্বপূর্ণ নকআউট পর্বের বড় অংশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে, যা নিয়ে আলোচনাও তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত, অভিবাসন নীতি এবং উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক বিশ্বকাপ আয়োজনের সময়ও আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে কানাডার সঙ্গে কূটনৈতিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রসঙ্গও আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
তবু মাঠের ফুটবল আপাতত সব আলোচনাকে ছাপিয়ে গেছে। বিশ্বের কোটি মানুষ এখন খেলায় মগ্ন। তবে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে যাবে। অনেকের মতে, সফল আয়োজন তিন প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে। সেই অর্থে ফুটবল কেবল প্রতিযোগিতা নয়, কূটনৈতিক যোগাযোগেরও একটি বড় মঞ্চ।
সিএ/এমই


