প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগে আল্পস পর্বতমালার একটি অঞ্চলে নিহত হওয়া ‘উতজি দ্য আইসম্যান’ নামে পরিচিত প্রাচীন এক মমির দেহে এখনও সক্রিয় অণুজীবের উপস্থিতি পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, হাজার বছরের পুরোনো এই মমিটি কেবল একটি সংরক্ষিত দেহাবশেষ নয়, বরং এটি এখনো একটি সক্রিয় জীববৈজ্ঞানিক বাস্তুতন্ত্র হিসেবে কাজ করছে।
ইতালি ও অস্ট্রিয়ার বর্তমান সীমান্তবর্তী আলপাইন অঞ্চলে নিহত হওয়া উতজির দেহ ১৯৯১ সালে বরফে ঢাকা একটি হিমবাহের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। ইউরোপের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে প্রাচীন প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত মানবদেহ হিসেবে পরিচিত।
গবেষণায় দেখা গেছে, উতজির দেহের ভেতর ও বাইরে তিন ধরনের অণুজীব সম্প্রদায় বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে তার জীবদ্দশার অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া, হিমবাহের পরিবেশ থেকে আসা ঠান্ডা সহনশীল অণুজীব এবং জাদুঘরে সংরক্ষণের সময় যুক্ত হওয়া আধুনিক অণুজীব।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ইস্টের বিস্তৃত উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘মাইক্রোবায়োম’-এ।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং ইতালির ইউরাক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর মমি স্টাডিজের অণুজীববিজ্ঞানী মোহামেদ সারহান বলেছেন, “আমাদের এ গবেষণায় প্রমাণ মেলে, উতজি কেবল এক স্থবির বা জৈবিকভাবে নিষ্ক্রিয় প্রাচীন অবশেষ নন, বরং তিনি নিজেই গতিশীল এক বাস্তুতন্ত্র।
“তার দেহে কিছু জীবন্ত ও বিপাক করতে পারে এমন অণুজীব বাস করছে, যা সক্রিয়ভাবে এদের আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় মানিয়ে নেওয়া এসব ইস্ট এখনও সংখ্যায় বাড়ছে।
“নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া তার দেহের টিস্যুগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে এবং কয়েক দশক ধরে টিকে আছে। বাস্তব অর্থেই এ মমিটি জ্যান্ত এক জৈবিক সংযোগস্থল, যা প্রাচীন বিশ্ব ও বর্তমানের এক মিলনমেলা, যেখানে পাঁচ হাজার বছর আগের বিবিন্ন অণুজীব গত দশকে আসা অণুজীবদের সঙ্গে সহাবস্থান করছে।”
গবেষকদের মতে, উতজির অন্ত্রে পাওয়া কিছু ব্যাকটেরিয়া প্রাক-শিল্পায়ন যুগের খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করছে। আধুনিক পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের শরীরে এসব অণুজীব প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে প্রাচীন মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস ও অন্ত্রের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
বর্তমানে ইতালির সাউথ টাইরল মিউজিয়াম অব আর্কিওলজিতে মাইনাস ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে উতজির দেহ। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, ঠান্ডাপ্রিয় কিছু ইস্টের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভবিষ্যতে মমিটির সংরক্ষণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মমিটি জাদুঘরে স্থানান্তরের পর আধুনিক অণুজীবের নতুন একটি স্তর যুক্ত হয়েছে। সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত আর্দ্রতা বজায় রাখার পদ্ধতিও কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
সিএ/এমআর


